সামাজিক অবক্ষয় : খুলনায় বখাটে যুবকদের উৎপাত

0
761
বিমল সাহা : নগরীর বিভিন্ন স্কুল কলেজের সামনে ও পাড়া-মহল্লায় বখাটে যুবকদের উৎপাত বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে করে বিড়ম্বনায় পড়ছে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। উঠতি বয়সের যুবকদের উৎপাতের প্রতিবাদ করতে গিয়ে হামলার শিকার হচ্ছেন কেউ কেউ। পাড়া মহল্লায় অনেকে তা আবার  মুখ বুজে সহ্য করছেন। অনেক অভিভাবক বখাটেদের ভয়ে মেয়েদের বাল্য বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে খুলনাসহ আশাপাশ অঞ্চলে সামাজিক অবক্ষয়ের সৃষ্টি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগীরা।
গত ১৩ অক্টোবর রাতে বখাটে শামীম হাওলাদার শুভ ও তার সহযোগীদের ইভটিজিংয়ের শিকার হয়ে খুলনা সরকারি করোনেশন বালিকা বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির মেধাবী ছাত্রী শামসুন নাহার চাঁদনী লবণচরা থানার হরিণটানার নিজ বাড়িতে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে। এঘটনায় পুলিশ অভিযুক্ত ৫ জনের চার জনকে গ্রেফতার করেছে।
গত ২৬ তারিখ বাল্য বিয়ের যন্ত্রনা থেকে মুক্তি পেতে আত্মহত্যা করে হাজী ফয়েজউদ্দিন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেণীর ছাত্রী শায়লা আক্তার মিম। প্রতিবেশি এক যুবকের হাত থেকে মেয়েকে রক্ষা করতে বিয়ে দিতে বাধ্য হয় তার পরিবার। এর এক দিন আগে কেশবপুর উপজেলার মাগুরাখালি গ্রামে বাল্য বিয়ে দেওয়ায় আত্মহত্যা করে আয়েশা খাতুন নামের অষ্টম শ্রেনীর এক ছাত্রী। তাকে জোর করে বিয়ে দেওয়ার পর শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হতো।
নাম প্রকাশ না করার শর্ত দিয়ে অনেকেই প্রবাহকে অভিযোগ করেছেন। তারা বলেছেন উঠতি বয়সি যুবকেরা নানা উপায়ে তাদের উত্তক্ত করে থাকে। বাড়ির খুব সন্নিকটে ওই যুবকেরা মাদক সেবন চিৎকার চেচামেচি, ইভটিজিং, বাড়ির চালে ঢিল ছোড়া, কারণে-অকারণে হুমকী দিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে।
খুলনা পাইওনিয়ার মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর দিনবন্ধু দেবনাথ প্রবাহকে জানান, বেশ কিছু দিন আগে কলেজের হোস্টেলের পাশে একটি নির্মাণাধীন ভবন থেকে মেয়েদের ভয় দেওয়া হতো। উচ্ছৃঙ্খল কিছু যুবক বাঁশ ও লাঠিসোটা দেখিয়ে মেয়েদের বিরক্ত করত। এরপর পুলিশে অভিযোগ দিলে সমস্যার নিরসন হয়।
সরকারী করোনেশন স্কুলের প্রধান শিক্ষক ইদ্রিস আলি আজিজি বলেন, চাঁদনীর আত্মহননের পর আমরা খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ বরাবর একটি অভিযোগ দায়ের করেছি। সেই অভিযোগে স্কুল চলাকালীন সময়ে উচ্ছৃঙ্খল যুবকদের আনোগোনা ঠেকাতে পুলিশি টহল জোরদার করার ব্যাপারে অনুরোধ জানিয়েছি।
একই স্কুলের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মৌলভীপাড়া সুলতান আহম্মেদ সড়কের বাবুর চায়ের দোকানের আশ-পাশে কিছু উচ্ছৃঙ্খল যুবক তাদের উত্তক্ত করেন। চলার পথে মেয়েদের আজেবাজে কথা বলে। গভীর রাত অবধি চিৎকার চেচামেচি করে। কিন্তু আশপাশের লোকজন ভয়ে কিছু বলতে পারেনা। কিছু বলতে গেলে বখাটে যুবকেরা তেড়ে আসে। হামলার ভয় দেখায়।
গোবর চাকা ন্যাশনাল হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক কৌশিক কুমার বর্মন জানিয়েছেন, স্কুলের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট থানায় একাধিক বার অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। পুলিশ মাঝে মাঝে টহল দিয়ে দেখে যায়। তারপরও কিছু যুবক লুকিয়ে থেকে মেয়েদের বিরক্ত করার চেষ্টা করে। তবে এখন তেমন অভিযোগ শোনা যাচ্ছে না।
মোঃ কামরুল ইসলাম নামে একজন অভিভাবক অভিযোগ করে বলেন, আমার কন্যা বয়রা হাজী ফয়েজ উদ্দিন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী। স্কুলে যাবার পথে টেক্সটাইল মিল এলাকায় কতিপয় এক যুবক প্রায় বিরক্ত করে। মেয়ের সাথে স্কুলে যাবার পথে আমি ওই যুবককে নিষেধ করি। এরপর সে কিছু বখাটেদের সাথে নিয়ে আমাকে শাসিয়ে যায়। পরে বাধ্য হয়ে বাসা পরিবর্তন করি।
সরকারী মজিদ মোমোরিয়াল সিটি কলেজের শিক্ষার্থী তানজিলা আক্তার অভিযোগ করে বলেন, এক সপ্তাহ আগে কলেজে একা যাওয়ার পথে তিন-চার জন যুবক আমার পিছু নিয়ে কথা বলতে চায়। এবিষয়ে বাসায় জানানোর পর মা আমাকে নিয়মিত কলেজে পৌছে দেয়।
খুলনা জেলা প্রশাসক আমিন উল আহসান জানান, বাল্য বিবাহের একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে বখাটেদের উৎপাত। এতে করে অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন হয়ে মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। নগরীর বিভিন্ন স্থানে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে বখাটেদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। যেসব পাড়া মহল্লাগুলোতে এধরণের সমস্যা রয়েছে। সেগুলো চিহ্নিত করতে তিনি নগরবাসীর সহায়তা কামনা করেছেন।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোঃ হুমায়ুন কবীর জানান, আত্মহত্যা বেড়েছে একথা সঠিক নয়। বিগতদিনের থেকে কেএমপিতে নারী নির্যাতন মামলার সংখ্যা কমেছে। আমাদের মাসিক পরিসংখা অনুযায়ী নির্দিষ্ট হারে নারী নির্যাতনের ঘটনা কমছে।