খুলনায় ফার্মেসীগুলোতে বিক্রি হচ্ছে রেজিস্ট্রিবিহীন ফুড সাপ্লিমেন্ট : মিলছে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ

0
732

কামরুল হোসেন মনি : খুলনা মহানগরীসহ ৯ উপজেলার ফার্মেসীগুলোতে বিক্রি হচ্ছে রেজিস্ট্রিবিহীন অবৈধ ফুড সাপ্লিমেন্ট। পাওয়া যাচ্ছে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধও। ওষুধ প্রশাসনের উদ্যোগে গত ৯ মাসে খুলনায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে বিভিন্ন অপরাধে ফার্মেসীগুলোকে ৮০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অভিযানে সত্ত্বেও এক শ্রেণির অসাধু ওষুধ বিক্রেতারা ফুড সাপ্লিমেন্ট এর নাম রাতারাতি পরিবর্তন করে অন্য নামে বিক্রি করছেন।
জানা গেছে, ওষুধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ ১৯৮২-এর ১৪ (এ) (১) উপ-ধারায় বলা আছে, রেজিস্ট্রিবিহীন ওষুধ রোগীর ব্যবস্থাপত্রে কোনো চিকিৎসক লিখতে পারবেন না। তা সত্ত্বেও ফুড সাপ্লিমেন্ট লেখা হচ্ছে। বর্তমানে বাজারে বিভিন্ন ফার্মেসীগুলোতে বিক্রি নিষিদ্ধ ফুড সাপ্লিমেন্ট বিক্রি হচ্ছে। ফার্মেসী দোকানীরা জানান, চিকিৎসকরা রোগীদের প্রেসক্রিপশনে ফুড সাপ্লিমেন্ট (কৌটা বা পটে বিক্রি হয় বলে পট কোম্পানির ওষুধ নামে পরিচিত) উল্লেখ করায় আমরা অনেক সময় ব্যবসায় টিকে থাকতে এসব মজুদ করে বিক্রি করি। চিকিৎসকরা যদি লেখা বন্ধ করে দেন তাহলে এই সব অবৈধ ফুড সাপ্লিমেন্ট বিক্রি কমে আসবে বলে তারা জানান।
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাঃ শৈলান্দ্র নাথ বিশ্বাস এর মতে কিছু কিছু প্রোভাইডিকস আছে, যেগুলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করার জন্য অনেক সময় চিকিৎসকরা গ্রহণের উপদেশ দিয়ে থাকেন। কিন্তু বাজারে যে ধরনের ফুড সাপ্লিমেন্ট বিক্রি হচ্ছে বেশির ভাগই এগুলো রোগ প্রতিরোধে বা রোগ উপশমে কোনো ভূমিকা রাখে না। এমনকি এগুলো গ্রহনের ফলে কিডনী ও লিভার মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখিন হতে পারে।
ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর খুলনা অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত গত ৯ মাসে খুলনা মহানগরীসহ ৯ উপজেলায় ফার্মেসীগুলোতে ড্রাগ সুপারের উদ্যোগে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। এ সময় ফার্মেসীগুলোতে বিক্রি নিষিদ্ধ ফুড সাপ্লিমেন্ট ও মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধ মজুদ থাকাসহ বিভিন্ন অপরাধে আনুমানিক ৮০ হাজার টাকা জরিমানা করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। এ সময়ের জব্দকৃত ৪০ হাজার টাকা ওষুধ ধ্বংস করা হয়। মহানগরীসহ পাইকগাছা রূপসা, দিঘলিয়া, দাকোপ ও তেরখাদা মিলে মোট ১১টি মোবাইল কোর্ট অভিযান পরিচালনা করা হয়।
সূত্র মতে, বিদেশ থেকে বিভিন্ন ধরনের ভেজাল ও নিম্নমানের ফুড সাপ্লিমেন্ট আমদানি করা হচ্ছে। অথচ সেগুলোই চকচকে মোড়কে ওষুধ হিসেবে নানা নামে বিক্রি করা হয় দেশের বাজারে। দামও ৫শ টাকা থেকে শুরু করে হাজার টাকার ওপরে। এগুলোর বেশিরভাগেরই গুণগতমান নিয়ে রয়েছে অভিযোগ। ওষুধ সেবনের পর রোগীর সমস্যা দেখা দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। যদিও এতো ফুড সাপ্লিমেন্টের প্রয়োজনীয়তা আসলেই আছে কি না তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে খোদ চিকিৎসকদেরই।
জানা গেছে, প্রতিনিয়ত শত শত রোগী কথিত কথিত ‘পট কোম্পানি’র এইসব ওষুধ কিনতে বাধ্য হচ্ছেন চিকিৎসকের দেওয়া প্রেসক্রিপশনের কারণে। আর অতিরিক্ত লাভের আশায় ওষুধের দোকানগুলোতেও এসব বিপদজনক উপাদান অহরহ বিক্রি হচ্ছে।
জানা গেছে, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা ছাড়াও মহানগর ও উপজেলার অন্তত ৩শ ওষুধের দোকানে ‘পট কোম্পানি’র (কৌটা বা পটে বিক্রি হয় বলে পট কোম্পানির ওষুধ নামে পরিচিত) ‘ফুড সাপ্লিমেন্ট’ বিক্রি হচ্ছে।
জানা গেছে, ফার্মেসীগুলোতে জয়েন্ট রাইট, ডাইয়ানী, রিম ক্যাল-ডি, রিম-বিয়ন, গ্লোয়িট, রিম-ভি, রিম ক্যাল-ডি, ফারটিভ, এক্সফিট, ল্যাকটোক্যাপ, ভিটা-থিয়োনি, ডারমা-কজ (ক্রীম) ডারমা-ই (ক্রীম), এলিভা বডি লোসন, কেটসম সোপ, কেটসম শ্যাম্পু, পাচ বিসি জেল, ড্রিম এন্ড শাইন, ডি-২৫, কার্টিকেয়ার, ক্যালোভিয়া, স্ট্রাক পলেন, ইভোনিয়া, ট্রিটমেন্ট জেল, ডিপ রয়েল,একলেস, ভ্যানভাক্স, এ্যালটো-৪০০, মেগা-৩, টু ডেক্স, মাল্টিক্যাল, ম্যাক্স ভি, গ্রিন-ইসহ প্রায় তিনশর মত আইটেম পাওয়া যাচ্ছে। ফুড সাপ্লিমেন্ট বিক্রেতা আব্দুল মতিন বলেন, তার বিএসটিআই এর কাছ থেকে অনুমোদন আছে, ডিআর নাম্বার আছে কি এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি এড়িয়ে যান।
ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর খুলনার ওষুধ তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ আব্দুর রশীদ এ প্রতিবেদককে বলেন, অবৈধ ফুড সাপ্লিমেন্ট ও মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধ মজুদকারীর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ফুড সাপ্লিমেন্ট কোনো ফার্মেসী বিক্রি করতে পারবে না। এটার নিষেধাজ্ঞা আছে। তার উদ্যোগে খুলনাসহ উপজেলাগুলোতে সংশ্লিষ্ট নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন অভিযানে ফার্মেসীগুলোতে অবৈধ ফুড সাপ্লিমেন্ট, রেজিস্ট্রিবিহীন ও মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধগুলো জব্দ করা হচ্ছে। এ সব মজুদ থাকার অপরাধসহ বিভিন্ন কারনে ফার্মেসীকে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত ১৪ আগস্ট নগরীর খানজাহান আলী থানাধীন ফুলবাড়ীগেট বাজারে বিকেলে ওষুধ ফার্মেসীতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়। মোবাইল কোর্ট ফুড সাপ্লিমেন্ট, মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধ এরং লাইসেন্স না থাকায় বাজারের ইসলাম ফার্মেসীকে ৫ হাজার টাকা এবং শেখ ফার্মেসীকে ৩ হাজার টাকা জরিমানা করেন। মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন দিঘলীয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা শম্পা কু-ু। অভিযানে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর খুলনার ওষুধ তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মাদ আব্দুর রশীদ উপস্থিত ছিলেন।