খুলনায় নিষিদ্ধ ওষুধ বিক্রিতে জড়িত বিসিডিএস কর্মকর্তারাই!

0
799

কামরুল হোসেন মনিঃ
নগরীর ক্লে রোডে হেরাজ মার্কেট পাইকারি ওষুধ বিক্রি হিসেবে পরিচিত। এ মার্কেটে ফিজিসিয়ান শ্যাম্পল, সরকারি বিক্রি নিষিদ্ধ ওষুধ, অনিবন্ধিত, নি¤œমান, মেয়াদোত্তীর্ণ, ফুড সাপ্লিমেন্ট, হারবাল ও ভারতীয় নিষিদ্ধ যৌন উত্তেজক ওষুধ অসাধু ব্যবসায়ীরা বিক্রির সাথে জড়িত রয়েছেন। বিভিন্ন অভিযানে ওষুধ আটক ও জরিমানাও করা হচ্ছে। খুলনা কেমিস্ট ও ড্রাগিস্ট সমিতির উদ্ধর্তন কর্মকর্তার দোকানে অভিযান চালিয়ে পাওয়া যাচ্ছে নিষিদ্ধ বিক্রি ওষুধ। তার পরেও থেমে নেই এই সব ব্যবসা।
এ কারণে অনেক সময় ড্রাগ প্রশাসনের কর্মকর্তারা অবৈধ ওষুধের বিরুদ্ধে অভিযান চালালে তখনই ওই সমিতির লোকজন শেল্টার দিয়ে থাকেন। যার কারণেই অভিযানের সত্বেও বন্ধ হচ্ছে না ভেজাল ও নিষিদ্ধ ওষুধের কেনাবাচা।
বৃহস্পতিবার হেরাজ মার্কেটে র‌্যাবের ৩য় দিনে অভিযানে মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধ ও ফিজিসিয়ার শ্যাম্পল থাকার অপরাধে দুইটি ফার্মেসী জরিমানা করেন ভ্রম্যামান আদালত। এর মধ্যে হেনা মেডিকেল হলকে মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধ থাকার অভিযোগে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক খুলনা জেলা শাখার সাবেক বিসিডিএস (অবৈতনিক) সম্পাদক এস এম আজিজুর রহমানের। এর আগে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে স্বাস্থ্য অধিদফতর, ওষুধ ও জেলা প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে নগরীর পাইকারী ওষুধের বাজার হেরাজ মার্কেটে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে খুলনা কেমিস্ট ও ড্রাগিস্ট সমিতির সভাপতিসহ ১৬ জন ব্যবসায়ীকে ১ লাখ ৬৯ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
এ অভিযানে উপস্থিত ছিলেন ওষুধ প্রশাসনের সহকারী পরিচালক ডা. মোঃ আকিব হোসেন, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এসএম জাহাঙ্গীর হোসেন, খুলনার ড্রাগ সুপার মাহমুদ হোসেন, সহকারী পুলিশ সুপার (এপিবিএন) আফতাব হোসেন, জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাবরিনা শারমিন ও মোঃ সামিউল হক। অভিযানে খুলনা কেমিস্ট এন্ড ড্রাগিস্ট সমিতির সাবেক ও বর্তমান সভাপতি মোঃ মোজাম্মেল হকের ওষুধের দোকান রহমান ফার্মেসিতে ১১ ধরনের নিষিদ্ধ ওষুধ পাওয়া যায়। ওই অভিযানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাবরিনা শারমিন তাকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করেন। নিষিদ্ধ এসকল ওষুধ মানব দেহের মারাত্মক ক্ষতিকর বলে ওই সময় ড্রাগ সুপারসহ ওষুধ প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন। এছাড়া ওই সময় আরও ৮-১০ ব্যবসায়ীকে জরিমানা করেন।
জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট  মোঃ জাকির হোসেন বলেন, বৃহস্পতিবার তাদের তৃতীয় দিনে র‌্যাবকে সাথে নিয়ে তারা অভিযান পরিচালনা করেছেন। তিনি বলেন, এর আগে যে গোডাউন ও ফার্মেসী দুটি সিলগালা করা হয়েছে। সেই দুইটি প্রতিষ্ঠানের মালিক পাপপু মেডিকেল হল ও সালমা ড্রাগ হাউজের মালিককে খুজে পাওয়া যায়নি। ফলে তাদের প্রতিষ্ঠানটি সিলগালা অবস্থায় থাকবে। এছাড়া বিভিন্ন ফার্মেসী দোকানগুলোতে অভিযান চালানো হয়। এ সময় ফিজিসিয়ান শ্যাম্পল (বিক্রি নিষিদ্ধ) বিপুল পরিমান ওষুধ থাকার অপরাধে তরফদার ফার্মেসীর মালিক এনামুলহককে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অপরদিকে হেনা মেডিকেল হলে মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধ থাকার অপরাধে ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক এস এম আজিজুর রহমানকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। তাকে ভোক্ত অধিকার সংরক্ষর আইন ২০০৯ এর ৫১ ধারা অনুযায়ী তাকে জরিমানা করা হয়। তিনি বলেন, কিছু দোকানগুলোতে ভাল অবস্থায় ব্যবসা করছেন তাদেরকে আমরা সাধুবাদ জানাই। তিনি বলেন, যতদিন পর্যন্ত হেরাজ মার্কেটে ভেজাল ওষুধ দুর না হবে ততদিন পর্যন্ত র‌্যাব-৬ ও ড্রাগ সুপারকে সাথে অভিযান অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, কি ভাবে কারা সরকারি বিক্রি নিষিদ্ধ ওষুধ ও ভেজলা ওষুধ এই মার্কেটে মজুদ করা হচ্ছে সে বিষয় আইন শৃঙ্খলা বাহিনী তৎপরতা রয়েছেন। অভিযানে র‌্যাব-৬ এর সিনিয়র সহকারি পুলিশ সুপার মোঃ নুরুজ্জামান বলেন, ভেজাল ও নি¤œ মানের ওষুধ ছেয়ে গেছে। এসব চক্রকে ধরতে একাধিক টিম মাঠে সক্রিয় রয়েছে।
খুলনা ড্রাগ সুপার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) রেহান হাসান বলেন, যে সব ওষুধ রেজিস্ট্রেশন আছে কি না সেগুলো আমাদের ড্রাগের ডাটা বেজে সার্চ করলে ধরতে পারি। যদি না পাওয়া যায় তাহলে ওই ওষুধ অনিবন্ধিত এবং বিক্রি নিষিদ্ধ। তাছাড়া ফিজিসিয়ান শ্যাম্পল ও ইন্ডিয়ান ওষুধ ওগুলো রেজিস্ট্রেশন নেই। আর যেগুলো সরকারি ওষুধ ওই গুলো ওষুধের গায়ে বিক্রি নিষিদ্ধ উল্লেখ থাকে। এগুলো আইডেন্টিফাই করে  আমরা দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি। ড্রাগ এ্যাট ১৯৪০ এর ১৮ ধারায় ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তি দেয়া হচ্ছে। যাদের ফার্মেসীতে লাইসেন্স নেই তারা ওই ধারায় দোষী সাব্যস্ত হবেন।
জানা গেছে, ড্রাগ লাইসেন্স প্রাপ্তী শর্ত সমূহ উল্লেখ থাকে। এর মধ্যে ৬ নম্বর শর্তে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে ফার্মাসীতে ফিজিসিয়ান স্যাম্পল ক্রয়-বিক্রয় করা যাইবে না। এছাড়া ৭ নম্বর শর্তে উল্লেখ রয়েছে ফার্মেসীতে ওষুধ ব্যতিত কোন পন্য (কসমেটিক পন্য ও কীটনাশক ইত্যাদি) মওজুদ ও বিতরন করা যাইবে না। কিন্তু এ সব শর্ত অধিকাংশই ফার্মেসীগুলো মানা হচ্ছে না। এই সব বিষয়ে খুলনা কেমিস্ট ও ড্রাগিস্ট সমিতির কর্তৃপক্ষ নিজেরাই নিষিদ্ধ ওষুধগুলো বিক্রি ও অনিয়মের সাথে জড়িয়ে পড়েছেন। স্থাণীয় প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে অ্যাকশান নিলে ওই সমিতির কর্তপক্ষ ও ফামের্সীর দোকানীরা ধর্মঘট ডাক দেওয়ার নজির রয়েছে। অর্থাৎ যারা এ বিষয়ে সর্তক করবেন তারাই ভেজাল, নিষিদ্ধ ওষুধ, সরকাররি ওষুধ ও আমদানী নিষিদ্ধ ওষুধ বিক্রেতাদেরকে উৎসাহিত দিয়ে থাকেন বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছেন। যার কারণে ওই মার্কেটের একাধিক আইন শৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালানোর পরেও বন্ধ হচ্ছে না ওই নিষিদ্ধ ওষুধ বিক্রি। এছাড়া অবৈধভাবে বিভিন্ন ফার্মেসীগুলোতে প্যাথেডিন ও মরফিন বিক্রি হচ্ছে।
এ ব্যাপারে খুলনা জেলা শাখার বিসিডিএস (অবৈতনিক) সম্পাদক কবির উদ্দিন বাবলু সার্বিক বিষয়ে এ প্রতিবেদককে বলেন, কমিটির কিছু ভুল রয়েছে স্বীকার করে বলেন, আমার খুব শিগগিরই জরুরী মিটিং কল করেছি। যাতে ভবিষ্যতে আর কোন অনিয়ম যাতে না হয়।
এ ব্যাপারে জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কার্যালয়ের উপ-পরিচালন মোঃ রাশেদুজ্জামান বলেন, কোন ফার্মেসীতে লাইসেন্স ব্যতিত মরফিন ও প্যাথেডিন বিক্রি করে থাকেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ বিষয়ে আমাদের সোর্স মাঠে রয়েছে। এছাড়া ফার্মেসীতে কোন ম্যাজিস্ট্রেট অভিযানের জন্য আমাদের সহযোগিতা নিতে চান তাহলে আমরা প্রস্তুতি রয়েছি।
উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার থেকে নগরীর হেরাজ মার্কেটে র‌্যাব-৬ ও জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের  নেতৃত্বে একটি টিম অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযানকালে ওই মার্কেটে তৃতীয় ও চতুর্থ সবকয়টি গোডাউনে তালা ঝোলানো ছিল। র‌্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে অনেকেই গোডাউনে তালা ঝুলিয়ে আত্মগোপনে চলে যান। ওইসব গোডাউনের সামনে রক্ষিত কার্টনগুলোতে বিভিন্ন ধরনের ফুড সাপ্লিমেন্ট সিরাপ ছিলো। অনেক সিরাপের বোতলে লেভেল ছাড়া ওষুধ দেখা যায়। পরবর্তীতে গোডাউনের মালিক খুঁজে না পাওয়ায় সিলগালা করা দেন। ##