খুলনায় দ্বিমুখী ঝুঁকিতে সাংবাদিকতা : উদ্বিগ্ন সাংবাদিক সমাজ : পুনরাবৃত্তি ঘটলেও প্রতিকার মিলছেনা

0
1176

সুমন আহমেদ ও এফএস ইসলাম,খুলনাটাইমস: 

খুলনায় পেশাজীবী সাংবাদিকেরা রয়েছেন চরম ঝুঁকিতে, ভুগছেন নিরাপত্তাহীনতায়। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালীন হরহামেশাই হামলা, হেনস্তা ও লাঞ্ছিত হচ্ছেন তারা। তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে নাবা প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তি দ্বারা হুমকি পাচ্ছেন, হামলার শিকার হচ্ছেন। তেমনি আবার তাদের প্রতি বিদ্রূপ আচরণ, হেনস্তা ও হামলা করছেন নিজ পত্রিকার নীতিনির্ধারকরাও। আর মালিক কর্তৃক শ্রমিকের আয়ের উৎস (বিজ্ঞাপন) বাগিয়ে নেয়ার ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে।

এভাবে দ্বিপক্ষীয় আক্রোশ ও আক্রমণের কারণেই খুলনায় সাংবাদিকদের জীবন ঝুঁকি বেড়ে গেছে মাত্রারিক্ত হারে। যা নিয়ে উদ্বিগ্ন গোটা সাংবাদিক সমাজ। একের পর এক এমন অপরাধের ঘটনা পুনরাবৃত্তি ঘটলেও একটির প্রতিকার মেলেনি, হয়নি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। সঙ্গত কারণে এ অবস্থা থেকে উত্তরণ করা যাচ্ছে না বলে অভিমত সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের।

শনিবার খুলনা প্রেস ক্লাব এবং সাংবাদিক সংগঠনগুলোর যৌথ সভায় এমন অভিমত ব্যক্ত করেন তারা। একই সাথে নিন্দা জ্ঞাপন করেন, করেন সুষ্ঠু বিচার দাবি ও প্রত্যেক ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির। এছাড়া খুলনা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মল্লিক সুধাংশু’র সাথে অশালীন আচরণকারী তেরখাদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. লিটন আলীকে ৭দিনের মধ্যে অপসারণ করার সাথে ঔদ্ধত্তপুর্ন ব্যবহারের দায়ে তার দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি দাবি তোলা হয়।

অন্যথায় খুলনার সর্বস্তরের সাংবাদিকরা ঐক্যবদ্ধ ধারাবাহিক আন্দোলন গড়ে তুলতে বাধ্য হবে বলে হুশিয়ারি উচ্চারন করেন তারা। পাশাপাশি দৈনিক সময়ের খবরের সাংবাদিক আল মাহমুদ প্রিন্সকে শারীরিক ভাবে প্রহৃত করা এবং দৈনিক তথ্যের তুহিনকে প্রাণ নাশের হুমকির নিন্দা জানানো হয়।

জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে দৈনিক খুলনাঞ্চল’র ফটোসাংবাদিক কাজী ফজলে রাব্বি শান্তকে জীবন নাশের হুমকি দিয়েছে খানজাহান আলী থানার যুবদল কর্মী ও তেলিগাতী রাজাপুর এলাকার জনৈক রবিউল ইসলাম। শনিবার দুপুরে নগর ও জেলা বিএনপি কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ চলাকালে তিনি শান্তকে এ হুমকি দেয়।

আর খুলনাসহ গোটা দেশের সুধী সমাজে আলোড়ণ সৃষ্টি হওয়া মহানগর মূখ্য হাকিম কতৃক নির্দেশে সিএমএম আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তার দায়ের করা সাংবাদিক সোহাগ দেওয়ান ও সিনিয়র সাংবাদিক কাজী মোতাহার রহমানের বিরুদ্ধে ৫৭ ও ৬৬ ধারার মামলা ঘটনাতো আছেই।

এর পর ১২ ফেব্রুয়ারী খুলনা থেকে প্রকাশিত দৈনিক অনির্বানের স্টাফ রিপোর্টার ও অনলাইন দৈনিক খুলনাটাইমস.কম এর সিনিয়র প্রতিবেদক সাংবাদিক ফকির শহিদুল ইসলামকে প্রাণনাশের হুমকি দেন কাস্টমস’র সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ।

১৪ ফেব্রুয়ারী খুমেক হাসপাতালে কেইউজে সদস্য, প্রথম আলো ট্রাস্ট এর মাদক বিরোধী সেরা প্রতিবেদক পুরুস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, দক্ষিণাঞ্চল পত্রিকার স্টাফ রিপোটার জয়নাল ফরাজীকে নাজেহাল করেন হাসপাতালে ডিউটিরত পুলিশ সদস্য সফি।

১৫ ফেব্রুয়ারী দৈনিক তথ্য পত্রিকার স্টাফ রিপোটার মোঃ তুহিনকে প্রানণাশের হুমকি প্রদান করা হয় । এ সকল ঘটনায় সাংবাদিকরা স্ব-স্ব থানায় জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে জিডি করলেও পুলিশ দৃশ্যমান কোন পদক্ষেপ গ্রহন করেনি ।

গত ১৬ ফেব্রুয়ারি খুলনার তেরখাদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. লিটন আলী ফোনে অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করে উপজেলার বিআরবি আজগড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও খুলনা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মল্লিক সুধাংশুর সাথে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকতার ফোনালাপপ স্কুল কমিটির সভাপতিকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্ল অর্ডার করা, মূলত: মানহানিকর ও হুমুকি দেয়ার সামিল। ঘটনাটি সাংবাদিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনসহ বিভিন্ন মহলে প্রচার হওয়ার পর চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

 

সূত্রমতে, উপজেলার বিআরবি আজগড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিস থেকে স্কুল কমিটির সভাপতির কাছে ফোন করা হয়। ফোনালাপের এক পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে স্যার না বলে ভাই বলায় মল্লিক সুধাংশুর সাথে তুচ্ছতাচ্ছিল আচরণ করেন তিনি। সাথে শাসকের ন্যয় নির্দেশ করতে থাকে। শেষে ফালতু লোক কোথাকার সম্বোধন করে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন ইউএনও।

খুলনা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সভাপতি মল্লিক সুধাংশু এ ব্যাপারে জানান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমার সাথে ফোনে যে আচরণ করছে তা মোটেই শোভনীয় নয়। একটি স্কুলের সভাপতির সাথে একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কোনভাবেই এ ধরণের আচরণ করতে পারেননা। আমি এমন অশ্লীল আচরণের বিষয়টি জেলা প্রশাসাককে জানানো হলেও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. লিটন আলীর বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসক কোন ব্যাবস্থা গ্রহন করেনি ।

সে কারনে খুলনায় কর্মরত সাংবাদিক, খুলনা প্রেসক্লাব ও খুলনা সাংবাদিক ইউনিয়নসহ সাংবাদিকদের বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত সাংবাদিককে তুচ্ছ তাচ্ছিল্ল, অর্ডার করা, মানহানিকর ও হুমুকি দেয়ার ঘটনায় সাংবাদিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনসহ বিভিন্ন মহলে প্রচার হওয়ার পর চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে খুলনা জেলা প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা সাংবাদিক মহলে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে ।

উল্লেখ,গত ২৯ জানুয়ারী মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের (আইসিটি) বিতর্কিত ৫৭ ধারাসহ কয়েকটি ধারা বিলুপ্তির বিধান রেখে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮’ এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। ৫৭ ধারার অপব্যবহার রোধে নতুন আইনে আরো একটি বির্তকিত ৩২ ধারা সংযোজন করে আইনটিকে আরো বির্তকিত করা হয়েছে । বিলুপ্ত ৫৭ ধারার চেয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ৩২ ধারাটি আরো আতংকের জন্ম দিয়েছে ।‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮’ এর কারণে স্বাধীন গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা হুমকির মুখে পড়ছে অভিমত সচেতন মহলের।

সাংবাদিক প্রিন্স লাঞ্ছিতর ঘটনায় জিডি: 

খুলনায় কর্মরত এক সাংবাদিক লাঞ্ছিত ও মারধরসহ নানা অভিযোগে শনিবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) রাত পৌণে ১১টায় সদর থানায় সাধারণ ডায়েরী (নং ৯৩৬) করা হয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি খুলনার একটি পত্রিকার সম্পাদক। অভিযোগ দাখিল করেন খুলনা সাংবাদিক ইউনিয়নের সদস্য ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আল মাহমুদ প্রিন্স। প্রিন্স দোষী ব্যক্তির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান, ন্যয় বিচার আবেদন করেন।

উল্লেখ্য, এই অভিযোগ ইতোমধ্যে খুলনা সাংবাদিক ইউনিয়ন (কেইউজে) এর সভাপতি/সাধারণ সম্পাদক বরাবর দাখিল করা হয়েছে। যার অনুলিপি প্রধানমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও গণমাধ্যম বিষয়ক উপদেষ্টা, তথ্যমন্ত্রী, তথ্য সচিব, বিএফইউজে-বাংলাদশে ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং উপাচার্য-খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, চেয়ারম্যান- বাংলাদেশ প্রেস কাউনন্সিল, খুলনা জেলা আওয়ামীলীগ এর নিকট ডাকযোগে পাঠানো হয়েছে।

 

অভিযোগে প্রিন্স বলেন, গত ১৫ ফেব্রিয়ারি’২০১৮ রাত আনুমানিক সাড়ে ৮টায় অফিসে কর্মরত ছিলাম। এসময় হঠাৎ করে কোনকিছুর বুঝে ওঠার আগেই মারমুখী হয়ে সে অতর্কিত হামলা চালায়। এসময় তিনি আমাকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে এলোপাতাড়িভাবে চড়-থাপ্পড়, কিল-ঘুষি মারতে থাকে।  তার এই আক্রমণের ফলে আমার বাম কান অবাশ হয়ে যায়, দম বন্ধ হতে থাকে, শ্রুতিহীন হয়ে পড়ি এবং ঘাড় ও কানে প্রচন্ড ব্যথা অনুভব হয়, যা এখনও বিদ্যমান।
এসময় আমার উপর শারিরীক নির্যাতনের কারণ জানতে চাইলে, অশ্লীল ও অকথ্য ভাষায় গালাগালি দিয়ে পুনরায় হিংস্র রুপে সে আমাকে মারতে উদ্যত হয়। পত্রিকার মফস্বল সম্পাদক আমাকে রক্ষা করে। এ অবস্থায় আমি চরম নিরাপত্তাহীনতা বোধ করে সকল ব্যথা, মানসিক কষ্ট ও যন্ত্রণা সহ্য করে রাত ১১টায় কর্মস্থল ত্যাগ করি। হামলাকারী একজন বদমেজাজী, রগচটা এবং মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী মানুষ। পক্ষান্তরে আমি স্বাধীনতার স্বপক্ষের সংগঠন খুলনা সাংবাদিক ইউনিয়নের সদস্য, রূপসা কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন, রূপসা শাখার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে নিয়োজিত। যেকারণে বরাবরই তিনি আমাকে বাঁকা চোখে দেখতেন। আমার উপর হামলার ঘটনা এরই প্রতিফলন ও পূর্বপরিকল্পিত। এর আগেও একাধীকবার আমাকে তুচ্ছ ঘটনায় অপমান ও লাঞ্ছিত করেছে সে।

শুধু আমি নই, আমার মতো স্বাধীনতার পক্ষ অবলম্বনকারী সাংবাদিক-কর্মচারীরা তার হামলার শিকার হয়েছে। যা তদন্ত করলে একের পর একটি ঘটনা বেরিয়ে আসবে। আর সচরাচর দূর্ব্যবহার, অসভ্য আচরণ, অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ, অযথা বেতন কর্তনের ঘটনাতো লেগেই থাকে। তবুও সবকিছু সহ্য করে এতদিন কাজ করেছি। তবে সর্বশেষ ঘটনা আমাকে মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছে। ফলে ঘটনার দিন রাতেই সম্পাদক মহোদয়ের বরাবর অব্যাহতি পত্র, বার্তা সম্পাদক মহোদয় এর মাধ্যমে জমা দেই এবং সহকর্মীদের কাছে মৌখিকভাবে কষ্টের বাণী শুনিয়ে কর্মস্থল ত্যাগ করি। ২০১২ সালের  জুন মাস হতে এ পত্রিকায় আমি কর্মরত আছি।