খুলনায় গণধর্ষণে নারী ক্রিকেটার অন্তঃস্বত্ত্বা : আপোষের অপচেষ্টা

0
446

ডেস্ক রিপোর্ট, খুলনাটাইমস:

খুলনার উদীয়মান নারী ক্রিকেটারে (১৪)। সে নগরীরর নীরালা কাশেম নগরের বাসিন্দা গোলাম মোস্তফার মেয়ে। কিশোরী মেয়েটি এ বছর জেএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। স্কুল পর্যায়ের বেশ কয়েকটি ক্রিকেট টুর্নামেন্টে অংশ নিয়ে চ্যাম্পিয়ন ট্রফিসহ বিভিন্ন পুরস্কারও পেয়েছে এই উদীয়মান নারী ক্রিকেটার।

এরই মাঝে মাতৃহারা নারী ক্রিকেটার গণধর্ষণের শিকার হয়। এখন অন্তঃস্বত্ত্বা কিশোরীর জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। সামাজিক ভাবে নানা বঞ্চনা, ধিক্কারে দিন দিন এই উদীয়মান নারী ক্রিকেটার ভেঙ্গে পরতে বসেছে। ইচ্ছা থাকলেও এখন আর প্রিয় খেলা ক্রিকেট নিয়ে ছুটতে পারছে না সম্ভাবনাময় এবং উদীয়মান এই ক্রিকেটার।

সেদিনের সেই ভয়ংকর ঘটনার বর্ণনায় সে বলে, “প্রতিবেশী নয়ন মামা আমাকে গল্লামারি যেতে বলে, ক্রিকেট খেলার জন্য। আমিও সেদিন তার কথামতো আমার বাসা থেকে অটোতে করে গল্লামারি যাই। সেখানে আগে থেকেই নয়ন মামা অপেক্ষা করছিল। আমি যাওয়ার পর নয়ন মামা আরেকটি অটো নিয়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে থেকে রিয়াল ভাইয়াকে অটোতে উঠিয়ে নেয়। তারপর কৈয়া ব্রিজ এলাকায় গিয়ে অটো পরিবর্তন করে। সেখান থেকে আবারও আরেকটি অটো নিয়ে কৈয়া ব্রিজ পার হয়ে মাঝের ভেরি নামক এলাকায় রিয়াল ভাইয়ের নানার মাছ ঘেরে নিয়ে যায়। সেখানে একটি ঘেরের বাসায় আমাকে বসতে বলে। কিছুক্ষণ পরে রিয়াল ভাইয়া ফোন করে তার এক মামাকে ডেকে আনে। এরপর দেখি তারা তিনজন বাইরে বসে কি যেনো খাচ্ছে ও ফিসফিস করে কথা বলছে। এসব দেখে আমি চলে আসতে চাইলে তারা অস্ত্র বের করে গুলি করে হত্যার ভয় দেখায় আমাকে। আমি খুব ঘাবড়ে যাই। নয়ন মামা বলে, ‘তুই যেতে পারবি না, আর এখানে যা হবে তা কাউকে বললে তোকে এবং তোর বাবাকে গুলি করে মেরে ফেলব’- এ কথা বলার পর নয়ন মামা ঘরে এসে জোর করে আমার সঙ্গে খারাপ কাজ করে। এরপর রিয়াল ভাইয়া এবং তার মামা এসেও খারাপ কাজ করে। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর একটি অটো ডেকে আমাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেয় তারা। আমাকে আর আমার বাবাকে গুলি করে মেরে ফেলবে এই ভয়ে আমি এতোদিন কাউকে কিছু বলিনি।”
ঘটনাটি কিশোরীর বাবা গোলাম মোস্তফা জানার পরে নিজে বাদি হয়ে রোববার খুলনা সদর থানায় ধর্ষণ মামলা দায়ের করেন। মামলায় ধর্ষক মোস্তাফিজুর রহমান নয়নসহ তিনজনকে আসামি করা হয়েছে। ধর্ষক নয়ন ২৪ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক, ওয়ার্ড পুলিশিং কমিটির সদস্য এবং ২ নম্বর কাশেম নগর জনকল্যাণ সমিতির সভাপতি ও ইট-বালু ব্যবসায়ী বজলুর রহমানের ছেলে।

কিশোরীর বাবা গোলাম মোস্তফা জানান, তার তিন মেয়ের মধ্যে বড় দুজনের বিয়ে দিয়েছেন। তারা স্বামীর সংসারে থাকে। এরই মধ্যে গত কোরবানির ঈদের পর তার স্ত্রী হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। তার ছোট মেয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ত। পাশাপাশি ক্রিকেট খেলত। সে বিভিন্ন স্থানে খেলায় অংশ নিয়ে অনেক পুরস্কার ও মেডেল পেয়েছে। যে কারণে এলাকার সবাই তাকে উৎসাহ দিত। নয়ন তাদের প্রতিবেশী হওয়ায় তার মেয়ে তাকে ‘মামা’ এবং রিয়ালকে ‘ভাই’ ডাকত। কিন্তু নয়নসহ তিনজন তার মেয়েকে ক্রিকেট খেলার কথা বলে কৈয়ার বিলে একটি ঘেরের বাসায় নিয়ে সর্বনাশ করেছে। তিনি ধর্ষকদের কঠিন বিচার দাবি করেন। যাতে করে অন্য কোন মেয়ের জীবন নষ্ট করতে না পারে। আমি সরকারের কাছে এই ঘটনার সুষ্ঠ কঠিন বিচার দাবি করছি।

সরেজমিনে অনুসন্ধান করতে কাশেম নগর এলাকায় গিয়ে জানা যায়, নারী ক্রিকেটার মেয়েটি ধর্ষকদের হত্যার হুমকির ভয়ে পুরো বিষয়টা এতোদিন নিজের ভিতরে চাপা রাখে। সে ওই ঘটনা এতোদিন কাউকে বলেনি। কিন্তু সম্প্রতি তার চলাফেরায় এক ধরনের পরিবর্তন স্পষ্ট হলে বাড়ির অন্য নারীরা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। এক পর্যায় সে বিষয়টি স্বীকার করে। এ সময় তার ডাক্তারি পরীক্ষায় অন্তঃস্বত্ত্বার বিষয়টি ধরা পড়ে। তখনই জানা যায় তার সাথে ঘটে যাওয়া বর্বর কাহিনী।

এদিকে, বিষয়টি জানাজানির পরে ধর্ষক নয়নের বাবা আওয়ামী লীগ নেতা বজলুর রহমান শুক্রবার রাতে জনকল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল সরদার, অ্যাডঃ উজ্জল, খুলনা মহানগর ছাত্রলীগের সহ সভাপতি রেজাউল করিম সবুজ, প্রাক্তন ব্যাংকার হাফিজুর রহমান এবং শেখ শাহজালালসহ কয়েকজনকে নিয়ে গোলাম মোস্তফার বাড়িতে যান। সেখানে তারা শালিসের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার জন্য কিশোরীর বাবাকে বিভিন্ন রকম প্রস্তাব দেয়। তখন গোলাম মোস্তফা ধর্ষক নয়নের সঙ্গে তার মেয়েকে বিয়ে এবং দেনমোহর (কাবিননামা) বাবদ ৫ লাখ টাকা প্রদানের শর্তে বিষয়টি মীমাংসা করতে রাজি হন। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতা বজলুর রহমান ৫০ হাজার টাকা দিতে রাজি হন। যে কারণে এক পর্যায়ে মীমাংসার উদ্যোগ ভেস্তে যায়।

বিষয়টি স্বীকার করে অভিযুক্ত নয়নের বাবা আওয়ামী লীগ নেতা বজলুর রহমান ছেলের পক্ষে সাফাই গেয়ে এ বলেন, ‘ওই মেয়েটি এলাকায় প্যান্ট-শার্ট পরে ছেলেদের মতো চলাচল করে, আর ক্রিকেট খেলে। তার কারণে এলাকার ছেলেরা খারাপ হয়ে যাচ্ছিল, যে কারণে মেয়েকে অন্য জায়গায় রেখে আসতে বলা হলেও তার বাবা শোনেনি। এখন আমার ছেলেকে জড়িয়ে ধর্ষণের অভিযোগ আনা হচ্ছে। বিষয়টি মীমাংসার জন্য তিনি এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করছেন বলেও উল্লেখ করেন।

খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এমএম মিজানুর রহমান জানান, এ ঘটনায় থানায় একটি মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। তবে আসামিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। অভিযান অব্যাহত রয়েছে। দ্রুত আসামিকে গ্রেপ্তার করা হবে। আমাদের কাছে কোন নেতার ছেলে মূখ্য বিষয় না। আইনের চোখে সে অপরাধী।