খুলনায় অসহায় রোগীদের ভরসাস্থল সদর হাসপাতালেরই অবস্থা বেহাল

0
460

কামরুল হোসেন মনি:
সরকারিভাবে নিয়ম রয়েছে চিকিৎসকদের সকাল ৮ টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত চেম্বারের অবস্থান করবেন। অথচ খুলনা জেনারেল হাসপাতালে গাইনী বিভাগে দুপুর পৌনে ১টার মধ্যেই চেম্বারের কোন ডাক্তারের দেখা মেলেনি। দীর্ঘ বছর ধরে রেডিওলজি চিকিৎসক না থাকায় বাইরে থেকে অসহায় রোগীরা আলট্রাসনো করাচ্ছেন। আবার কোন ডায়াগণস্টিক স্টোরের যাবেন তাও রোাগীদের বলে দিচ্ছেন কমিশন প্রাপ্তি চিকিৎসকরা। এ সুযোগে বহিরাগত ডায়াগণস্টিক সেন্টার দালালদেরও আনাগোনা বেড়েছে। দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা হলেই কোন গাইনী রোগী ভর্তি নিচ্ছেন না। হয় না রাতের ওটি। হাসপাতালে জনবলের তিব্র সংকট, অবকাঠামো সমস্যা ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরে অভাবে খুলনাঞ্চলের অসহায় রোগীদের ভরসাস্থল এই হাসপাতালের চিত্র প্রতিদিনের।
এ ব্যাপারে সিভিল সার্জন ডাঃ এ এস এম আব্দুর রাজ্জাক শনিবার সন্ধ্যায় সার্বিক বিষয়ে এ প্রতিবেদককে বলেন, সকাল ৮টা থেকে দুপুর আড়াই পর্যন্ত চিকিৎসকরা চেম্বারে থাকার নিয়ম রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের আগে চিকিৎসক যাওয়ার বিষয় তিনি অবগত নন, জেনে বিষয়টি বলতে পারবেন। রাতের ওটি বিষয় তিনি বলেন, আগে এনেসথেসিয়া চিকিৎসক ছিল না, এখন আছে তো রাতেও জরুরী ভিত্তিতে ওটি হওয়ার কথা বলে তিনি মন্তব্য করেন।
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডাঃ মাহবুবুর রহমান বলেন, রাতে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসকদের অনকলে জরুরি ভিত্তিতে রোগীদের ওটি করা হচ্ছে। ওটির বিষয়টি রাতে হয় না যে বলেছেন ভুল তথ্য দিছেন। তিনি বলেন, হাসপাতালে চিকিৎসকসহ জনবল সংকট থাকার কারণে কিছুটা রোগীদের সমস্যা হচ্ছে, জনবল সংকট দুর হলেই এই সমস্যা আর থাকবে না।
এদিকে হাসপাতালকে ১৫০ শয্যা থেকে  ২৫০ শয্যায় বাস্তবায়ন, আইসিইউ ও সিসিইউ ইউনিট চালু, জনবল বৃদ্ধি, সিসি ক্যামেরা অন্তর্ভূক্ত, ডায়গনস্টিক ব্যবসার অবৈধ কমিশন বন্ধ, জরুরী বিভাগ থেকে রোগী অন্য হাসপাতালে পাঠানো বন্ধ, পুরাতন এ্যাম্বুলেন্সের পরিবর্তে নতুন এ্যাম্বুলেন্স, রোগীদের স্বাস্থ্যকর খাবার পরিবেশনসহ ২৪ ঘন্টা সার্জারী এবং পৃথক গাইনী অপারেশন থিয়েটার চালু রাখার দাবি জানিয়ে শনিবার হাসপাতালের সামনে মানবন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। হাসপাতাল উন্নয়ন ও অসহায় দুস্থ রোগীদের সেবামুলক সংস্থা এবং একুশের সামাজিক সংগঠন এর আয়োজক।
শনিবার পৌনে ১টার দিকে এ প্রতিবেদক হাসপাতালের গাইনী বিভাগে গেলে চেম্বারের কোন চিকিৎসকদের দেখা মেলেনি। প্রতিটি ডাক্তারদের চেম্বার তালা ঝুলানো। পাশের একটি রুমে এক নার্স বলেন, রোগী না থাকায় চিকিৎসকরা চলে গেছেন। সরকারিভাবে নিয়ম আছে, সকাল ৮ টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত চিকিৎসকরা চেম্বারে অবস্থান করবেন। রোগী থাকুক বা না থাকুক, নির্ধারিত সময়ের আগে কোন চিকিৎসক চেম্বার ত্যাগ করার সুযোগ নেই।
রূপসা নৈাহটির বাসিন্দা গৃহবধূ তাসলিমা খাতুন। তিনি গর্ভবতী। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ওই হাসপাতালে নিয়ে আসা হলে ওখানকার গাইনী ওয়ার্ডে নার্সরা বলেন, এখন ভর্তি হবে না। খুমেকে নিয়ে যান। যেখানে ২৪ ঘন্টা গাইনী বিভাগ চালু থাকার নিয়ম থাকলেও রোগীরা সেই সেবা থেকে বঞ্ছিত হচ্ছেন। রাতের বেলায় ডাক্তার না থাকা ও ওটি চালু না হওয়াসহ নানান অজুহাত দেখিয়ে রোগীকে অন্য হাসপাতালে রেফার্ড করা হচ্ছে। ডিজিটাল এক্সরে ও আলট্রাসনো বিভাগ চালু থাকলেও জুনিয়ার কনস্যালটেন্ট রেডিওলজি চিকিৎসক পদ শুন্য থাকায় অসহায় রোগীরা বাইরে থেকে আলট্রাসনো করাতে বাধ্য হচ্ছেন। তাও আবার চিকিৎসকরা তাদের মনোনীত ডায়াগণস্টিক সেন্টারের করার পরামর্শ দিচ্ছেন। ফলে কাঙ্খিত চিকিৎসা সেবা না পেয়ে রোগীরা এ হাসপাতাল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
হাসপাতালের অপারেশন (ওটি) ইনচার্জ সিনিয়র স্টাফ নার্স রেহানা খাতুন বলেন, দীর্ঘ ৫-৬ বছর ধরে রাতের বেলায় ওটি হচ্ছে না। এ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসক সংকটের কারণে বন্ধ রয়েছে। দিনের বেলায় একজন রয়েছেন তিনি সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত করেন। তাই রাতের বেলায় ওটি বন্ধ থাকে।
হাসপাতালে সদ্য যোগদানকারী ওয়ার্ড মাস্টার শেখ আজিজুল ইসলাম বাবু বলেন, সুইপার ও ওয়ার্ড বয় সংকট থাকার কারণে হাসপাতাল পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা ও রোগীদের সেবা দিতে ব্যাহৃত হচ্ছে। দিনের বেলায় জোড়াতালি দিয়ে চললেও দুপুর ও রাতের বেলায় চতুর্থ শ্রেনী কর্মচারি সংকট লেগেই আছে।
জানা গেছে, হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকসহ প্রথম শ্রেনীর পদ রয়েছে ৩৪টি। এর মধ্যে সিনিয়র কনসালটেন্ট চক্ষু, শিশু ও ইএনটি, জুনিয়ার কনসালটেন্ট রেডিওলহি ও প্যাথলজি এবং প্যাথলজিস্ট ও এ্যানেসথেটিস্ট চিকিৎসকসহ ৮টি পদ খালিয়ে রয়েছে। এর মধ্যে জুনিয়ার কনসালট্যান্ট রেডিওলজি ডা: বিশ্বজিৎ ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি বদলী হওয়ার পর থেকেই পদটি শুন্য রয়েছে। এছাড়া সিনিয়র কনসালটেন্ট ইএনটি ডাঃ গোলাক বিহারী ২০১৬ সালে ১০ অক্টোবর পিআরএল, চক্ষু কনসালটেন্ট ২০১১ সালে ২৯ সেপ্টেম্বর এলপিআর চলে যাওয়ার পদটি এখনো শুন্য রয়েছে। রেডিওলজিস্ট শুন্য পদে ডাঃ সানজিদা হুদা ২০১৬ সালে ৩ ডিসেম্বর তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করানো হয়। এ ছাড়া মালি, নাইটগার্ড, সুইপার সংকট তো রয়েছেই। এর মধ্যে ওয়ার্ড বয় আয়া নিয়ে ৩ জন, কুক/মশালচী ৬ জন, স্ট্রেচার বেয়ারা ২ জন এবং সুইপার পদে ৮টি পদ শুন্য রয়েছে। এছাড়া ভেসজ কর্মচারী দুইটি পদের মধ্যে দুইটিই শুণ্য রয়েছে হাসপাতালটি জন্মলগ্ন থেকে। বর্তমানে হাসপাতালটির আন্তবিভাগে প্রতি মাসে ২ হাজার থেকে ২২শ’ ও বহির্বিভাগে প্রায় ১৬ থেকে ১৮ হাজার রোগী চিকিৎসা নিলেও এসব সমস্যার কারণে রোগীরা যথাযথ চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন না। ফলে অনেক সময়ই জরুরী বিভাগ থেকে রোগী ফিরিয়ে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এদিকে খুলনা জেনারেল হাসপাতালকে আধুনিকায়নের দাবিতে হাসপাতাল উন্নয়ন ও অসহায় দুস্থ রোগীদের সেবামুলক সংস্থা এবং একুশের সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে শনিবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে হাসপাতালের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। সংগঠনের চেয়ারম্যান মোঃ আরাফাত হোসেন পল্টু’র সভাপতিত্বে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন খুলনা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও নগর যুবলীগের আহবায়ক এ্যাড. আনিসুর রহমান পপলু। এ সময় বক্তারা খুলনা জেনারেল হাসপাতালকে ১৫০ শয্যা থেকে  ২৫০ শয্যায় বাস্তবায়ন, আইসিইউ ও সিসিইউ ইউনিট চালু, পর্যাপ্ত, ডাক্তার, নার্স, কর্মচারী ও জনবল বৃদ্ধি, সিসি ক্যামেরা অন্তর্ভূক্ত, ডায়গনস্টিক ব্যবসার অবৈধ কমিশন বন্ধ, জরুরী বিভাগ থেকে রোগী অন্য হাসপাতালে পাঠানো বন্ধ, পুরাতন এ্যাম্বুলেন্সের পরিবর্তে নতুন এ্যাম্বুলেন্সের দাবি, রোগীদের স্বাস্থ্যকর খাবার পরিবেশনসহ ২৪ ঘন্টা সার্জারী এবং পৃথক গাইনী অপারেশন থিয়েটার চালু রাখার দাবি জানান।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন খুলনা শ্রমিক ইউনিয়ন ১২১২ এর সভাপতি নাসির উদ্দিন খান, খুলনা ইট-বালু সমিতির সভাপতি শেখ রফিকুল ইসলাম, একুশে সামাজিক সংগঠনের জেনারেল সেক্রেটারী মিঠুন বিশ্বাস, একুশে সামাজিক সংগঠনের নেতা অঞ্জন মন্ডল, শাহাদাৎ ইসলাম, মোঃ আবু সাঈদ খান, আলাউদ্দিন মিঠুন, অমিত সরকার গনেশ, ইদ্রিস আলী জোয়ার্দার, অনিমেষ সরকার, শামীম হাওলাদার, নান্নু সরদার, বাবুল হোসেন, বকুল ইসলাম, শহিদুল ইসলাম প্রমুখ।