খুলনার নৌ-পথে ৮টি ল্যান্ডিং ষ্টেশন নির্মাণ ও ৩৫টি উন্নয়নের উদ্যোগ

0
291
উন্নয়নের জন্য প্রস্তাবিত ২৪টি খেয়াঘাট নমুনা মডেল

এস আহমেদ:
খুলনা বিভাগের নৌ-পথে ৮টি ল্যান্ডিং ষ্টেশন (ঘাট) নির্মাণ ও ৩৫টি সংস্কারের মাধ্যমে উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ। এজন্য ইতোমধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২০টি নৌ-রুটের প্রায় ২৩’শ কিলোমিটার সমীক্ষা করেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ’র পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সিইজিআইএস। মোংলা বন্দর ও ঘষিয়াখালী চ্যানেলের ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে এ অঞ্চলের নদীসমূহ পুনরুদ্ধার ও রক্ষণাবেক্ষণ অপরিহার্য হয়ে পড়ায় এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
গত ৯ নভেম্বর খুলনা জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সেমিনারে খুলনা বিভাগের নদীসমূহের নাব্যতা বৃদ্ধি, ন্যূনতম জলাবদ্ধতা, জলাভূমি বাস্তু পুনরুদ্ধার, সেচ ও ল্যান্ডিং সুবিধাদি বৃদ্ধি করে নদী ব্যবস্থাপনার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের খসড়া চূড়ান্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করে বিআইডব্লিউটিএ। সমীক্ষার খসড়া প্রতিবেদনে বলা হয়, যাত্রী ও পণ্য ব্যবহারের বর্তমান অবস্থা ও প্রক্ষেপণ বিশ্লেষণপূর্বক নৌ-রুটের ল্যান্ডিং ষ্টেশন উন্নয়নের পরিকল্পনা নেয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় অত্যাধুনিক সুবিধাদি সম্বলিত নতুন করে ৪টি লঞ্চ ও ৪টি পর্যটন ঘাট নির্মাণের সাথে পুরাতন ১১টি লঞ্চ ও ২৪টি খেয়াঘাট উন্নয়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।
খসড়া প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রস্তাবিত নতুন ৪টি লঞ্চঘাট নির্মিত হবে নড়াইল জেলার সদর উপজেলার রূপগঞ্জে ১টি, শেখ হাটিতে ১টি, লোহাগড়া উপজেলার বরদিয়ায় ১টিঁ এবং সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার বরদাল হাটে ১টি। প্রস্তাবিত এই ঘাটগুলোতে স্টিল জেটি, পল্টুন, সিড়ি ও র‌্যাম্প, পার্কিং, বিশ্রামাগার, টয়লেট, পানির ব্যবস্থা ও অন্যান্য অত্যাধুনিক সুবিধাদির সাথে নির্মিত হবে বলে জানানো হয়।
পর্যটন কেন্দ্রর জন্য প্রস্তাবিত ৪টি ঘাটসমূহ হচ্ছে- যশোর উপজেলার কেশবপুরের মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়ি, খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার কবি কৃষ্ণচন্দ্র ইনস্টিটিউট, কয়রার মসজিদকুড় মসজিদ ও যশোরের অভয়নগরের এগারো শিব মন্দির। এসব ঘাটের অত্যাধুনিক সুবিধাদির মধ্যে থাকছে- নৌকা ঘাট, সৌর বিদ্যুৎ চালিত বাতি, সিঁড়ি ও র‌্যাম্প, পার্কি, খাবারের দোকান, টয়লেট, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা ও অন্যান্য।
উন্নয়নের জন্য প্রস্তাবিত ১১টি লঞ্চঘাটসমূহ হচ্ছে- খুলনা সদর থানার নতুনবাজার লঞ্চঘাট, পাইকগাছার সান্তা লঞ্চঘাট, কয়রার গিলাবাড়ি লঞ্চঘাট, ভান্ডারপুল লঞ্চঘাট, খিরল লঞ্চঘাট, নারায়ণপুর লঞ্চঘাট ও মদিনাবাদ লঞ্চঘাট, বাগেরহাট জেলার পিরোজপুর সদরের বলেশ^ও পুরাতন ঘাট ও শরণখোলার রায়েন্দা ঘাট, সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলার মণিপুর লঞ্চঘাট ও একশরা লঞ্চঘাট।

লঞ্চঘাট’র জন্য প্রস্তাবিত নমুনা মডেল

উন্নয়নের জন্য প্রস্তাবিত ২৪টি খেয়াঘাটসমূহ হচ্ছে- যশোর জেলার অভয়নগর উপজেলার নেয়াপাড়া খেয়াঘাট, খুলনার ফুলতলা উপজেলায় শিরোমণি ঘাট, খুলনা নগরীর দৌলতপুর থানার দৌলতপুর মহেশ^রপাশা, মাগুরা সদরের বাতাজোড় ও গঙ্গারামপুর খেয়াঘাট, মাগুরা মোহাম্মদপুরের কামারহাট খেয়াঘাট, নড়াইলের কালিয়া উপজেলার বাড়ইপাড়া খেয়াঘাট ও পেরুলিয়া খেয়াঘাট, নড়াইল সদরের গোবরা খেয়াঘাট, খুলনার তেরখাদা উপজেলার বেলে খেয়াঘাট, দিঘলিয়া উপজেলার কলাবাজার খেয়াঘাট, পাইকগাছার সোলাদান খেয়াঘাট, দাকোপের বাজুয়া খেয়াঘাট, বাগেরহাট জেলার রামপাল উপজেলার কালিগঞ্জ খেয়াঘাট ও মোংলার মামারঘাট, সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনির কল্যাণপুর খেয়াঘাট, শ্যামনগরের নাজকাটি ঘাট ও নাওবিকি খেয়াঘাট, কুষ্টিয়া জেলার সদর উপজেলার বড়বাজার খেয়াঘাট, কুমারখালির তেবাদা, খোকসা সদর খেয়াঘাট ও খোকসা’র বনগ্রাম খেয়াঘাট, রাজবাড়ি’র পাংশা উপজেলার নান্দুরিয়া খেয়াঘাট ও ফরিদপুরের মধুখালির নওপাড়া খেয়াঘাট।
প্রস্তাবিত এই খেয়া ঘাটগুলোতে সিড়ি ও র‌্যাম্প, যাত্রীদেও বসার সুবিধা, কাউন্টার, টয়লেট, পানির ব্যবস্থা, সৌর বিদুৎ চালিত বাতি ও অন্যান্য অত্যাধুনিক সুবিধাদির সাথে নির্মিত হবে বলে জানানো হয়।

পর্যটন কেন্দ্রর জন্য প্রস্তাবিত ৪টি ঘাট নমুনা মডেল

সমীক্ষার আওতাধীন নৌপথসমূহ হচ্ছে- রুট-১ আশাশুনি-এলারচর, রুট-২ বড়দিয়া-লোহাগড়া-কালাচানপুর, রুট-৩ চালনা-পাইকগাছা-আশাশুনি-প্রতাপনগর-নীলডুমুর, রুট-৪ (ক) চৌগাছা-ঝিকরগাছা-কালাওরা-তালা-পাইকগাছা, রুট-৪ (খ) বড়দাল হাট-কয়রা, রুট-৫ ঝিনাইদহ-মাগুরা-যশোর-নড়াইল-গাজীরহাট, রুট-৬ আলাইপুর-বাগেরহাট-ঘষিয়াখালী, রুট-৭ খুলনা-আলাইপুর-ছাগলাদাহ-গোপালগঞ্জ, রুট-৮ বটিয়াঘাটা-পাইকগাছা, রুট-৯ খুলনা-গাজীরহাট-বড়দিয়া-মানিকদাহ, রুট-১০ খুলনা-মোংলা-ঘষিয়াখালী-ঝালকাঠি, রুট-১১ (ক) মেহেরপুর-চুয়াডাঙ্গা-নীলমনিরগঞ্জ-বোয়ালিয়া হাট, ১১ (খ) বোয়ালিয়া হাট-আলমডাগা-জাউদিয়া হাট, ১১ (গ) কুষ্টিয়া-শৈলকুপা, ১১ (ঘ) সদরপুর হাট-শৈলকুপা-মাগুরা, রুট-১২ মথুরাপুর হাট, দৌলপতপুর, কুষ্টিয়া-নওদাপাড়া গোডাউন, মিরপুর কুষ্টিয়া, রুট-১৩ মোংলা-জয়মনিরহাট-সুপতি খাল-টাইগার পয়েন্ট, রুট-১৪ গড়াই মুখ-কুষ্টিয়া-বালিয়াকান্দি-কাশিয়ানী-বড়দিয়া, রুট ১৫ নওয়াপাড়া-চাপাতলা-যশোর, রুট-১৬ পাইকগাছা-বেনারপোতা, রুট-১৭ (ক) রায়মঙ্গল-চালনা, রুট-১৭ (খ) হাদ্দা ফরেস্ট অফিস-ঘুগড়াকাঠি, রুট-১৭ (গ) চৌদ্দরাশি ব্রিজের নিচের সংযোগ, রুট-১৭ (ঘ) বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট অফিস-কাশিগাটা ফরেস্ট ক্যাম্প, রুট-১৮ মাদার গাং, রুট-১৯ বেলগাছি (পদ্মা নদী)-অর্পারা (মধুমতি নদী), রুট-২০ (ক) চুয়াডাঙ্গা-ঝিনাইদহ-মাগুরা ও রুট-২০ (খ) মাগুরা-কালাচাঁনপুর।
সূত্র জানায়, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীসমূহে বর্ষাকালে পর্যাপ্ত নাব্যতা থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে পলি জমে নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় এর পানি ধারণ ক্ষমতা হ্রাস পায়। উজানে অবস্থিত বেশিরভাগ নদীসমূহের সাথে গঙ্গা/পদ্মার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে নদী সমূহের তলদেশ উঁচু হয়ে একদিকে যেমন জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে বন্যার ঝুঁকি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়াও গড়াই নদীর মুখে পলি জমে পানির প্রবাহ হ্রাস পাওয়ায় এ অঞ্চলে লবণাক্ততার মাত্রা ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, খুলনা বিভাগের নদী ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে পরিবেশগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক আঙ্গিক বিবেচনায় রেখে একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা করাই এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য। প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্যগুলো হলো : নদীসমূহ ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে পুনরুদ্ধার ও নাব্যতা বৃদ্ধি; নৌপথের নিরাপদ ও সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিতকরণ; পর্যটন, জলজ পরিবেশ, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন; জলাবদ্ধতা দূরীকরণ; বর্তমানে উপস্থিত ঘাট বা ল্যান্ডিং স্টেশনের সার্বিক অবস্থার উন্নয়ন ও নতুন ঘাট বা ল্যান্ডিং স্টেশন নির্মাণের ক্ষেত্রে উপযুক্ত স্থান নির্বাচন করা। পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি প্রাপ্তির পরই এ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হবে।
প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, প্রকল্পের যথাযথ বাস্তবায়ন হলে নৌপথ পুনরুদ্ধার; পরিবহন খরচ হ্রাস, স্থলপথে পরিবহন খরচ হ্রাস, স্থলপথে ট্রাফিক জ্যাম ও দুর্ঘটনা হ্রাস; বন্যার প্রকোপ ও জলাবদ্ধতা হ্রাস; পানির গুনগত মানোন্নয়ন; নদীর মাছের উৎপাদ বৃদ্ধি ও বাসস্থানের উন্নয়ন; পলির পরিমান হ্রাস; সেচের পানির প্রাপ্যতা বৃদ্ধি ও ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি, গৃহস্থলী কাজের জন্য পানির প্রাপ্যতা বৃদ্ধি; ঘাট স্থাপনার জন্য যাত্রী ও মালামাল উঠানামায় সুবিধা বৃদ্ধি, পর্যটনকেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে এলাকার সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি; স্থানীয় জনগণের কর্মস্থানের সুযোগ; সার্বিকভাবে এলাকার মানুষের মানোন্নয়নসহ সামগ্রিকভাবে বেশ কয়েকটি ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাবে।