খুলনার নিউজপ্রিন্ট মিলস্ বিক্রির প্রতিবন্ধকতা – প্রধান ফটকে সোনালী ব্যাংকের নোটিশ

0
821
?

নিজস্ব প্রতিবেদক:
খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলস্ বন্ধের ১৭ বছর পর মিলের প্রধান ফটকে বন্ধকী নোটিশ ঝুঁলিয়েছে সোনালী ব্যাংক। হঠাৎ করে মিল কর্তৃপক্ষ জমি হস্তান্তর ও ভাঙার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে বিধায় গত বৃহস্পতিবার এ নোটিশ ঝুঁলানো হয়েছে। মিলের কাছে ব্যাংকের বকেয়া টাকা পরিমাণ ৩১৫ কোটি। দু’টি প্রতিষ্ঠান সরকারি হওয়ায়, ঋণ আদায়ের জন্য এখনও কোন মামলা করা হয়নি। তবে, নিউজপ্রিন্ট মিলস্ বিক্রির প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির জন্য সোনালী ব্যাংকের এ পদক্ষেপ।
ভৈরব নদের তীরে খুলনা নগরীর গোয়ালপাড়া মৌজায় ১০১ একর জমির উপর ১৯৫৭ সালে খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হয়। পাঠ্যপুস্তক, র‌্যাপার বোর্ড ও সংবাদপত্র মুদ্রণে কাগজের চাহিদা পূরণ করতে ১৯৫৯ সালে উৎপাদন শুরু হয়। সুন্দরবনের গেওয়া কাঠ নির্ভরশীল এ মিলের বার্ষিক উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করা হয় ৪৮ লক্ষ মেট্রিক টন। দেশ স্বাধীনের পর থেকে মিলে ক্রমাগত লোকসান হতে থাকে। লোকসান এড়াতে বিসিআইসি কর্তৃপক্ষ ২০০২ সালের ৩০ নভেম্বর খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলের উৎপাদন বন্ধ ঘোষনা করে। নিউজপ্রিন্ট চালু থাকা অবস্থায় মিলের কাঁচামাল সংগ্রহ করতে সোনালী ব্যাংক কর্পোরেট শাখা থেকে ১৯৯৮ সালে মিলের ৮৮ দশমিক ৬৭৫ একর জমি বন্ধক রেখে ৫৭ কোটি টাকা ঋন গ্রহন করে। যা ২০১৮ সালে সুদে আসলে ৩৭০ কোটি ২৪ লাখ ৭৬ হাজার টাকা দাড়িয়েছে। গত বছর নিউজপ্রিন্ট মিল ৫৫ কোটি ৯৫ লাখ ১৬ হাজার টাকা বকেয়া পরিশোধ করেছে, বর্তমানে ব্যাংকের বকেয়া টাকা পরিমাণ ৩১৫ কোটি। খুলনায় সোনালী ব্যাংকের সবচেয়ে বড় ঋণ খেলাপী নিউজপ্রিন্ট মিল।
২০১৫ সালে বিসিআইসি কর্তৃপক্ষের এক বোর্ড সভায় নিউজপ্রিন্ট মিলের জমি বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়। জমি কেনার জন্য নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানী লিমিটেড এর সাথে সরকারের চুক্তি হয়। শিল্প মন্ত্রণালয়ের সাথে বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানীর ৫০ একর জমি বিক্রির জন্য মূল্য নির্ধারণ হয় ৫৮৬ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এতে বলা হয় ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২৫৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা ও ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩৩২ কোটি ১০ লাখ টাকা দেওয়া হবে। সে অনুযায়ী এ অর্থবছরের ২০১৮ সালের ১১ নভেম্বর নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানী লিমিটেড ২শ’ কোটি টাকা শিল্প মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। বাকি ৫৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা এ বছর এপ্রিল মাসে দেওয়ার কথা ছিল। তবে মিল সূত্রে জানা যায়, নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানী এখনও কোন যোগাযোগ করেনি।
এ বছর ফেব্রুয়ারি মাসে নিউজপ্রিন্ট মিলের ৫০ একর সম্পত্তির উপর নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানীর সীমানা খুটি স্থাপনের পর সোনালী ব্যাংক নড়ে চড়ে বসেছে। মিলের জমির মালিকানা হস্তান্তরের পূর্বে সকল বকেয়া পরিশোধের জন্য ব্যাংক ফেব্রুয়ারি মাসে মিল, বিসিআইসি কর্তৃপক্ষ ও পাওয়ার কোম্পানীকে চিঠি দিয়েছে সোনালী ব্যাংক। তবে চিঠির কোন উত্তর বা মিল কর্তৃপক্ষ সোনালী ব্যাংকের সাথে কোন আলোচনা না করায় মিলের প্রধান ফটকে বন্ধকী নোটিশ লাগানো হয়েছে।
সোনালী ব্যাংক, খুলনা কর্পোরেট শাখার ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মুন্সী জাহিদুর রশীদ জানান, নিউজপ্রিন্ট মিল কর্তৃপক্ষ হঠাৎ করে মিলের জমি অন্য জায়গায় হস্তান্তর ও ভাঙার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। যেহেতু প্রতিষ্ঠানটি মর্টগেজ অবস্থায় রয়েছে তা জানিয়ে দেওয়ার জন্য মিলের প্রধান ফটকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। আগেরও মিলের ভেতরে অনুরূপ দু’টি নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানকে ছোট করার জন্য নয়, আইনগত প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তা জানানোর জন্য এ পদক্ষেপ। কবে নাগাদ বকেয়া টাকা পরিশোধ করবে, এ সম্পর্কেও নিউজপ্রিন্ট মিল কর্তৃপক্ষ কিছু বলেনি। এতদিন পর বন্ধকী নোটিশ কেন? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দু’টি প্রতিষ্ঠানই সরকারি তাই একটি সমঝোতার মধ্যে ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে মিলের জমি অন্য জায়গায় হস্তান্তর ও ভাঙার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে বলে বিভিন্ন মাধ্যমে আমরা জানতে পারি। তার কারণে এতদিন পর প্রধান ফটকে নোটিশ।
নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানীর সহকারী প্রকৌশলী ইমতিয়াজ আহমেদ জানান, মিলের ৫০ একর জমির ওপর ৮০০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন কমবাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি হবে। কেন্দ্রে ভারত থেকে আমদানি করা তরলকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করা হবে।
মিলের এক সূত্র জানান, নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানীর নির্ধারিত ৫০ একর জমি কবে রেজিস্ট্রি হবে তার দিনক্ষণ এখনও চুড়ান্ত হয়নি। আর কবে নাগাদ ব্যাংকের বকেয়া পরিশোধ হবে তাও চুড়ান্ত হয়নি। তবে আলোচনা করে তাদের পাওনা পরিশোধ করা হবে।