খুমেক হাসপাতালে বার্ন এন্ড প্লাষ্টিক সার্জারি পুড়ে যাওয়া মানুষের বাঁচার আর্তনাদ : এক বছরে মৃতের সংখ্যা ২৮

0
971

# ওষুধ পর্যাপ্ত থাকলেও নেই ড্রেসিংয়ের আনুসঙ্গিক সরঞ্জাম
# অপারেশন থিয়েটার থাকলেও নেই যন্ত্রাংশ
# হতদরিদ্র রোগীর স্বজনরা চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন
কামরুল হোসেন মনি:
বৃদ্ধা কনিকা (৫০)। ২৬ নভেম্বর কাঠের চুলায় রান্না করতে গিয়ে তার শরীরের অগ্নিদগ্ধ হয়। প্রায় ৬৫ ভাগ উপরে তার শরীর পুড়ে যায়। খুমেক হাসপাতালে ভর্তি হলে তার বাঁচার আর্তনাদে হাসপাতালে পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল সোমবার সকালে মারা যান। তার মতো পুড়ে যাওয়া মানুষের বাঁচার আর্তনাদ বার্ন ইউনিটে কান পাতলে শোনা যায়। এই ইউনিটে পর্যাপ্ত ওষুধ সরবারহ থাকলেও নেই পুড়ে যাওয়া মানুষের ড্রেসিংয়ের আনুসঙ্গিক সরঞ্জাম। যার কারণে হতদরিদ্র রোগীরা চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে।


চলতি বছরের ২৬ নভেম্বর পর্যন্ত শিশুসহ ৬৬৪ জন রোগীকে সেবা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে মারা যান ২৮ জন রোগী। রোগীর তুলনায় বেড সংখ্যাক কম থাকায় ফ্লোরে দেয়া হচ্ছে চিকিৎসা। এতে রোগীর ক্ষত স্থানে ধুলা-বালি লেগে ইনফেকশনের হওয়ার সম্ভবনা বেশি থাকে।
বার্ন ও প্লাষ্টিক সার্জারি ইউনিট সূত্রে জানা গেছে, খুলনা বিভাগের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগুনে পুড়ে যাওয়া, গরম পানি, এসিড ঝলসে যাওয়া রোগীরা এখানে চিকিৎসা সেবা নিচ্ছেন। ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২৬ নভেম্বর পর্যন্ত শিশুসহ ৬৬৪ জন ্েরাগীকে চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়। এ সময় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ২৮ জন। এদের মধ্যে আগুনে পুড়ে যাওয়া, গরম পানিতে ঝলসে যাওয়া, ইলেকট্রিক র্সট, এসিডে দগ্ধ রোগী রয়েছেন। এদের মধে আগুনে পুড়ে ও গরম পানিতে ঝলসে যাওয়া রোগীর সংখ্যা বেশি।


খুলনা মেডিকেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ এটি এম মঞ্জুর মোর্শেদ সার্বিক বিষয়ে এ প্রতিবেদককে বলেন, জেনারেল ওটি বন্ধের উপক্রম হতে যাচ্ছে উল্লেখ করে বলেন, গত ৪-৫ বছর ধরে অপারেশন থিয়েটারের নতুন করে কোন ভারি যন্ত্রপাতি কেনা হয়নি। ওই সব যন্ত্রপাতি দুই বছর অতিক্রম হলেই বিভিন্ন ত্রুটি দেখা দেয়। এ্যানাসথিয়াসহ অন্যান্য মেশিনপত্র
ওই সব যন্ত্রগুলো ১-২ বছরের বেশি ওয়ারেন্টি থাকে না। সরকার যদি খুব দ্রুত এই খাতে টাকা বরাদ্দ না দেয় তাহলে জেনারেল ওটি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হবে। তিনি বলেন, টাকা বরাদ্দ  পেলেই আরও ৩টির ওটির সাথে মোট ৬টি ওটি চালু করার চেষ্টায় আছি। বার্ন ইউনিটে বেডের অনুমোদন আছে ১০টি রোগী থাকে ৩০ জনের পরে। যার কারণে খাবারের সংকট রয়েছে। গরীব রোগীদের জন্য সমাজ সেবা থেকে সাহায্য দেয়া হচ্ছে। তার পরেও যাতে রোগীদের কোন সমস্যা না হয় সেই দিকে লক্ষ্য রাখা হচ্ছে।
ওই সূত্র মতে, ওই ইউনিটে জানুয়ারি মাসে ৭৮ জন রোগীকে চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে মারা যান ৫ জন। একইভাবে ফেব্রুয়ারি মাসে ৭৫ জনের মধ্যে মারা যান ৬ জন, মার্চে ৭৩ জনের মধ্যে ৮ জন, এপ্রিলে ৮৩ জনের মধ্যে ১ জন, মে’তে ৭৩ জনের মধ্যে ৩ জন, জুনে ৪৩ জনের মধ্যে ১ জন, জুলাইতে ৪০ জন, আগষ্টে ৪২ জনের মধ্যে ২ জন, সেপ্টেম্বরে ৫৯ জনের মধ্যে ১ জন, অক্টোবরে ৫৩ জনের মধ্যে ১ জন মারা যান। এছাড়া ২৬ নভেম্বরে ৪৫ জনকে চিকিৎসা দেয়া হয়। ওই সময়ের মধ্যে কেউ মারা যায়নি। এছাড়া উল্লিখিত রোগীদের মধ্যে উন্নতি চিকিৎসার জন্য ৪৭ জন রোগীকে ঢাকায় বার্ণ ইউনিটে রেফার্ড করা হয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ৪০ জনের ওপরে রোগী ভর্তি থাকে। ২০ বেড হলেও অনুমোদিত বেডের সংখ্যা রয়েছে ১০টি। বাকিরা রোগীদের খাবার বরাদ্দ না থাকায় হতদরিদ্র রোগীরা অসহায় হয়ে পড়েছেন। ওষুধ, ব্যান্ডেজ ও গজ বাদে আর কোন কিছুর সাপ্লাই নেই। বার্ন এন্ড প্লাষ্টিক সার্জারী বিভাগের সহকারি রেজিস্ট্রোটার ডাঃ মোঃ ফরিদ উদ্দিন বলেন, একটি বার্ন ইউনিটে পৃথক অপারেশন থিয়েটার (ওটি) খুবই গুরুত্বপুর্ণ বিষয়। কিন্তু ওটি থাকলেও নেই যন্ত্রাংশ। এছাড়া এই ইউনিটে পোড়া রোগীদের কোন মতেই ফ্লোরে চিকিৎসা করার নিয়ম নেই, কারণ এই সব রোগীদের ক্ষত স্থানে ইনফেকশন হওয়ার ভয় থাকে বেশি। যে কারণে খুলনার বাইরে সরকারি হাসপাতালে বার্ণ ইউনিটগুলোতে এসি রয়েছে। ডেসিংয়ের জন্য রয়েছে অত্যাধুনিক সরঞ্জাম। সে দিক থেকে এ হাসপাতালে অবহেলিত। তিনি বলেন, এসিড বা আগুনে কোন মানুষ দগ্ধ হলে তাকে হাসপাতালে আনা পর্যন্ত দগ্ধ জায়গায় প্রচুর পরিমান বিশুদ্ধ পানি ঢালতে হবে। রোগীর তুলনায় বেড সংখ্যাক কম থাকায় বাধ্য হয়ে আমরা ফ্লোরে চিকিৎসা দিচ্ছে। আর এতে রোগীর ইনফেকশন হওয়ারও ভয় থাকে বেশি। ১০ বেডের বেশি খাবার বরাদ্দ না থাকায় হত দরিদ্র রোগীরা চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। আগুনে পুড়ে যাওয়া রোগীদের চিকিৎসা খুবই ব্যয় বহুল।
বার্ন ইউনিটে গিয়ে দেখা গেছে, অপারেশন থিয়েটার রয়েছে ওই ইউনিট জন্ম থেকেই। কিন্তু নেই অপারেশ থিয়েটারের কোন যন্ত্রাংশ। মুল অপারেশন রুমটি একটি জানালা নেই, নেই পানির ব্যবস্থা। বৈদি্যুতিক পাখা থাকলেও ওটি অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। পাশের ড্রেসিং রুমে এক শিশুর আর্তনাদ চিৎকার ভেসে আসে। তার বুকে ও পেটে গরম ডালে ঝলসা যায়। ২য় শ্রেণীর ছাত্রী শিশু সুমাইয়া আক্রার খালেদা (১০)। গত ১৫ নভেম্বর সকালে রান্না ঘরে ভাত নারতে গিয়ে শরীরে আগুন ধরে যায়। তার পেট থেকে বুক পর্যন্ত আগুনে পুড়ে গেছে। ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার খালা  বলেন, ডুমুরিয়া উপজেলা বাসিন্দা মেয়েটি বাবা নিজাম বিশ্বাস কৃষি কাজ করে সংসার চালান। ওই দিন মেয়েকে আগুনের হাত থেকে বাচাতে গিয়ে মা জবেদা বেগম দুই হাত পুড়ে যায়। নাছিমা বলেন, হাসপাতাল থেকে ওষুধ দিচ্ছে। কিন্তু ড্রেসিংয়ের জন্য বাইরে থেকে দামি ক্রিম ও অন্যান্য জিনিস কিনে আনতে হচ্ছে। প্রতিদিন ড্রেসিংয়ের জন্য খরচ হচ্ছে ১ হাজার ৪শ’ টাকা। কোন কোন সময় এর চেয়েও বেশি লাগে। গ্রাম থেকে যারা দেখতে আসছেন, তারা কিছু সামান্য পরিমান সাহায্যে দিচ্ছেন। তাতেও তার চিকিৎসা ব্যয় মিটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। বার্ন ইউনিটে বেড সংখ্যাক থাকায় অগ্নিদগ্ধ রোগীদের ফ্লোরে চিকিৎসা সেবা দেয়া হচ্ছে। ##