খুমেক হাসপাতালে ডাক্তারের চেম্বারে আগে  ওষুধ প্রতিনিধিদের ভিজিট, পরে রোগীরা

0
837

কামরুল হোসেন মনি:
খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে দিনকে দিন ওষুধ প্রতিনিধিদের দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রচ- ভিড়ে যেখানে রোগীদের দাঁড়ানো কষ্টকর, সেখানে ওষুধ প্রতিনিধিদের দীর্ঘ লাইন। আগে ওষুধ প্রতিনিধিদের ভিজিট শেষ হওয়ার পর লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা রোগীকে ডাক্তারের চেম্বারে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে। যেন অঘোষিত – আগে ওষুধ প্রতিনিধিদের ভিজিট পরে, রোগীদের সুযোগ। শনিবার সকাল ৯টার দিকে খুমেক হাসপাতালে বহিঃবিভাগের এই চিত্র। ওষুধ প্রতিনিধিদের ভিজিটের নির্ধারিত দিন ও সময় কাগজ কলমে উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে চিত্র একেবারেই ভিন্ন। চিকিৎসকদের সাথে ওষুধ প্রতিনিধিদের আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত গোপন সখ্যতা থাকায় কেউ এই নিয়মের ধার ধারেন না, উল্টো রোগীদের লাঞ্ছিত হওয়ার মত ঘটনা ঘটছে।
এ ব্যাপারে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ এটিএম মঞ্জুর মোর্শেদ বলেন, ওষুধ প্রতিনিধিদের ভিজিটের সময় উল্লেখ করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সকালে একটি নির্দিষ্ট সময়ও উল্লেখ করো দিয়েছি এর মধ্যে হাসপাতালের ক্যাম্পাসে প্রবেশ নিষেধ। তারপরও যদি কেউ নিয়ম না মানে সেক্ষেত্রে কঠোর হতে বাধ্য হবো।
খুমেক হাসপাতালে সকাল ৯টা ৫ মিনিটে বহিঃবিভাগের গাইনী চেম্বারে গিয়ে দেখা যায়, ডাক্তারের চেম্বারের সামনে দুইটি লাইন। কেউ হঠাৎ দেখলে মনে করবে পুরুষরাও দেখাতে আসছে গাইনীতে। তারা হচ্ছে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি। দূর-দূরান্ত থেকে এসে মহিলা রোগীরা লাইনে দাঁড়িয়ে চিকিৎসকের জন্য অপেক্ষা করলেও আগে ওষধু প্রতিনিধিদের ঢুকতে দিচ্ছেন। ওই চিত্র গাইনী বিভাগে অর্থোপেডিক্স রুম নং ১০৭ ও ১০৬নং রুমে। ওখানে দায়িত্বরত কর্মচারীরা বলেন, ডাঃ জুলেখা আক্তার জলি গাইনী বিভাগে (অর্থোপেডিক্স) গাইনী রোগী দেখেন। মেডিসিন বিষয়ে গাইনী চিকিৎসক ডাঃ তানিয়া রহমান।
নগরীর বয়রা এলাকার থেকে আসা নুরুল ইসলাম। তার স্ত্রী সন্তান সম্ভাবা। এ প্রতিবেদককে বলেন, রোগীদের চিকিৎসা আগে না বাইরে ওষুধ প্রতিনিধিদের ভিজিট আগে। তারপর মহিলা রোগ বিষয়সংক্রান্ত হুট-হাট করে পুরুষ মানুষ ঢুকে যাচ্ছে। আমরা এর প্রতিবাদ করলেই উল্টো মারতে চলে আসবে। আপনারা বিষয়টি একটু কর্তৃপক্ষকে বলেন। এই চিত্র শুধু বহিঃবিভাগের গাইনী চেম্বারের না, ওই হাসপাতালের বহিঃবিভাগের সব চেম্বারের একই চিত্র চোখে পড়ে। বহিঃবিভাগে চক্ষু ও শিশু বিভাগ, মানসিক, চর্ম ও যৌন, নাক কান ও গলা বিভাগ এবং সার্জারি ও মেডিসিন বিভাগের সব চিকিৎসক চেম্বারের একই অবস্থা। গরমে দীর্ঘ রোগীদের লাইনে চিকিৎসকের সাক্ষাত ও অন্যদিকে ওষুধ প্রতিনিধিরা হুট-হাট করে ডাক্তারের সাথে খোশগল্পে মেতে থাকেন। শুধু রোগীরা না, হাসপাতালের কর্মরত স্টাফ নার্স ও অন্যান্য কর্মচারীরা একই অভিযোগ তোলেন। তারা বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমরা কিছুই বলতে গেলে রেগে ওঠেন। অনেক সময় আমাদের আত্মীয় স্বজনরা আসলেও একই পরিস্থিতির শিকার হতে হয়।
শরিনবার বহিঃবিভাগে গাইনী বিভাগের ১০৬নং রুমে দেখা গেছে, মহিলা রোগীরা বাইরে সারিবদ্ধভাবে লাইনে দাঁড়ানো। পাশে ওষুধ প্রতিনিধিদের লাইন। এক এক করে প্রবেশ করছেন। আবার রোগীর সাথে তাদের যেতে দেখা যায়। মহিলাদের চোখে মুখে বিরক্তির ছাপ থাকলেও মুখে বলার যেন তাদের ভাষা নেই। শুধু এই হাসপাতালে না সরকারি সব হাসপাতালে যেন একই চিত্র। অনেক সময় রোগীর আত্মীয় স্বজন বা রোগীরা প্রতিবাদ করলেও তারা উল্টো লাঞ্ছিত হন। হাসপাতালে দালাল মুক্ত ও ওষুধ প্রতিনিধিদের আসার নিয়মকানুন উল্লেখ বা দেওয়ালে সাঁটানো থাকলেও নেই কোন কার্যতঃ কোন পদক্ষেপ।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে ফুলতলা উপজেলার আলকা গ্রামের বাসিন্দা রোগী এসএম বুলবুল আহমেদ শহীদ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে আসলে হাসপাতালে থাকা ওষুধ প্রতিনিধিদের হাতে লাঞ্ছিত হন। এ সময় ওই রোগীকে কয়েকজন ওষুধ প্রতিনিধি লাঞ্ছিতসহ জামা-কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী এস এম বুলবুল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। এ ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ৩ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেন। পরবর্তীতে কর্তৃপক্ষ ওষুধ প্রতিনিধিদের ভিজিট সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেন। এছাড়া দোষীদের বিরুদ্ধে আজীবন হাসপাতালে প্রবেশের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন।