খালিশপুরে গৃহকর্মী মেরেজানকে হত্যার অভিযোগ স্বজনদের : সুষ্ঠ বিচারের দাবি

0
532

ইয়াছিন আরাফাত/ফকির শহিদুল ইসলাম:
খুলনার খালিশপুরে মেরেজান বেগম (৫৫) নামের এক গৃহকর্মীর মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গৃহকর্তা ও তার স্ত্রী অত্যাধিক নির্যাতন করে তাকে হত্যা করেছে বলে মৃতের স্বজনদের অভিযোগ। ঘটনাটি ঘটেছে শুক্রবার (২৫ অক্টোবর) দিবাগত রাতে খালিশপুর আলমনগর মোড়স্থ পালপাড়া মামুন হোসেনের বাড়িতে। এ ঘটনায় নিহতের ছেলে হাসান শেখ খালিশপুর থানায় অভিযোগ দিয়ে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার আবেদন জানায়।

হাসান খুলনাটাইমসকে বলেন, বারান্দার গ্রীলের সাথে শাড়ি পেচিয়ে আত্মহত্যা করা কি সম্ভব? তাছাড়া আত্মহত্যা করলে গলায় তিন ইঞ্চি দাগ বসে যাবে, তবে দাগ ছিল দু’ইঞ্চিরও কম। তাছাড়া গলায় নখের আছড় দেখা গেছে। আর যদি রাত বারোটায় মারা যায়, তবে মায়ের শরীর ঠান্ডা থাকার কথা নয়। এছাড়া তার মা সেই বাড়িতে থাকতে চাইতেন না। সবসময় বলতেন, মামুনের স্ত্রী প্রায়ই তাকে বেদম প্রহার করতো। তবে সর্বশেষ তাদের অনেক অনুরোধে সে যেতে বাধ্য হয়। যদিও আমি আমার মাকে যেতে দিতে চাইনি।

অভিযোগে মৃতের আরেক স্বজন রফিকুল ইসলাম খুলনাটাইমসকে জানান, ওই দম্পতি বেড়াতে যাওয়ায় তার বোনও বাড়িতে চলে আসে। তারা আসলে মামুন গত রবিবার (২১ অক্টোবর) বাড়ি থেকে ডেকে নেয়। এরপর বৃহস্পতিবার (২৫ অক্টোবর) মামুন ফোন করে হাসানকে বলে, তোমার মা খুব অসুস্থ, দ্রুত এসে তাকে নিয়ে যাও। আমরা গিয়ে দেখি সে ফ্লোরে পড়ে আছে, ততক্ষণে সে মৃত। পরে এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি- মৃর্ত্যুর একদিন আগেই শিক্ষিকা তার কর্মস্থলে বলেছেন, গৃহকর্মীকে অনেক মারধর করা হলেও সে চুরির কথা স্বীকার করছে না। মিথ্যা অভিযোগ এনে আমার মাকে মেরে ফেলা হয়েছে, আমি এর সঠিক বিচার চাই জানান  নিহতের ছেলে হাসান শেখ ।

মৃতের স্বজনরা দাবি করেন, রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মেরেজানের উপর একচেটিয়া নির্যাতন চলে। এলাকায় খোঁজখবর নিলে তারা একথা জানতে পারে। অত্যাধিক নির্যাতনের কারণে তার মৃর্ত্যু হয়। এছাড়া তারা আরও অভিযোগ করেন, ওইদিন পুলিশ তাকে থানায় ডেকে পাঠায় এবং এক আবেদনে স্বাক্ষর দিতে বলেন। অপরাগতা প্রকাশ করলে তাকে এক পুলিশ সদস্য (কনস্টাবল) ধমক দিয়ে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করান। এসময় পুলিশ বলেছে, স্বাক্ষর না দিলে তোর মায়ের লাশ পাবি না।

জানা যায়, প্রায় চার মাসের অধিক সময় ধরে মামুন হোসেনের বাড়িতে ওই গৃহকর্মী কাজ করেন। গৃহকর্তী কানিজ ফাতেমা মধ্যপাড়া প্রাইমারী স্কুলের একজন শিক্ষিকা। তার পিতা আব্দুস সামাদ কুয়েত প্রবাসী। এই দম্পতি দুজনেই কর্মজীবী হওয়ায় তাদের দু’সন্তানকে দেখভাল করার দায়িত্ব ছিল মেরেজান বেগমের।

সরেজমিনে, এবিষয়ে জানতে চাইলে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি ওই বাড়ির ভাড়াটিয়া নৌ বাহিনীতে কর্মরত এক সদস্য। এছাড়া ঘটনাস্থলের পাশের রুমের ভাড়াটিয়ার বাসা পাল্টানোর চিত্র চোখে পড়ে, জানতে চাইলে তারা বলেন, টাকা দিয়ে কেউ আতংকে থাকতে চায়? তাই চলে যাচ্ছি। মামুন হোসেন এর ঘরে প্রবেশ করে ঘটনাস্থল দেখতে চাইলে, উপস্থিতরা দরজা বন্ধ করে দেয়। পরে সোহরাব নামে এক ব্যক্তি ঘটনাস্থল পরিদর্শন এবং যশোরে কর্মরত সাংবাদিক পরিচয় দেন। এসময় সে বলে, পুলিশ ও জনপ্রতিনিধিরা ঘটনা দেখে আত্মহত্যা নিশ্চিত করেছে। অনেক সাংবাদিকও ছিল তখন। নতুন করে বলার কিছু নেই। এসময় বাড়ির কর্তা মামুন ও তার স্ত্রীকে পাওয়া যায়নি, তারা ফের বেড়াতে গিয়েছেন বলে দাবি স্বজনদের।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কতিপয় ব্যক্তি দাবি করেছে, এটি আত্মহত্যা নয়, নিশ্চিত হত্যা। বাড়ির লোকজন স্থানীয় হওয়ার সুবাদে জনপ্রতিনিধি, পুলিশকে ম্যানেজ করে মীমাংসার জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে।
খালিশপুর থানা পুলিশের এসআই মান্নান হাওলাদার মুঠোফোনে খুলনাটাইমসকে বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ ফোর্স সঙ্গে নিয়ে দেখি ওই গৃহবধূর মৃতদেহ। ঘটনাস্থল থেকে লাশটি উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। এখনো সুরতহাল রিপোর্ট পাওয়া যায়নি। তবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নিশ্চিত বলা যায়, সে আত্মহত্যা করেছে। তার ঘাড় বেকে ছিল এবং গলায় কালো দাগ পরিলক্ষিত হয়। তবে হত্যার কোন আলামত মেলেনি। ময়না তদন্ত প্রতিবেদন পেলে মৃতের স্বজনদের সাথে কথা বলে পরবর্তী আইনী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বাড়ির গৃহকর্তা মামুন হোসেন জানান, ফজরের নাম পড়তে উঠে দেখি নিজের কক্ষে বুয়া নেই। পরে বারান্দায় গিয়ে তার ঝুলন্ত লাশ দেখতে পাই। তাৎক্ষণিক খালিশপুর থানায় হাজির হয়ে পুলিশকে অবগত করলে তারা এসে লাশ উদ্ধার করে। ইতোপূর্বে চুরির অভিযোগে কাজের বুয়ার বিরুদ্ধে থানা জিডি করা হয় বলে জানান তিনি। তবে জিডির নম্বর জানাতে ব্যর্থ হয়। তাছাড়া কোন পুলিশ কর্মকর্তা চুরির ঘটনা তদন্তে আসে তাও বলতে পারিনি।

প্রসঙ্গত: খুলনার খালিশপুর আলমনগর মোড়স্থ পালপাড়া এলাকার বঙ্গবন্ধু স্কুলের পাশে মেরেজান বেগম (৫৫) গলায় রশি দিয়ে আত্মহত্যা করে। সে দিঘলিয়া সেনহাটি হাজিগ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা এবং মোকসেদ শেখের স্ত্রী। এঘটনায় ২৫ অক্টোবর কেএমপি’র খালিশপুর থানায় অপমৃর্ত্যু মামলা (২১) হয়েছে। এজাহারে উল্লেখ, ২৫ অক্টোবর দিবাগত রাত সাড়ে ১২টা হতে ভোর ৫টান মধ্যে যেকোন সময় সে আত্মহত্যা করে। ভোর সোয়া ৮টায় পুলিশ লাশ উদ্ধার করে।