কৌতুক অভিনয় শিল্পী হিসেবেই নিজেকে বাঁচিয়ে রাখেতে চান খুলনার আমিরুল

0
1250

বিনোদন ডেস্ক, খুলনা টাইমস :

জীবন সংগ্রামী একজন অভিনেতা আমিরুল ইসলাম বিটিভির ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদির শিল্পী হতে চায়। মনের আদম্য ইচ্ছা বিটিভির জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদির পরিচালক হানিফ সংকেতের সাথে সাক্ষাতের। কিন্তু সে ইচ্ছা পূরণ হয়নি। তবে একজন কৌতুক অভিনয় শিল্পী হিসেবে এ পর্যন্ত কয়েকটি যাত্রাপালায় অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছেন আমিরুল। কৌতুক অভিনয় শিল্পী হিসেবেই নিজেকে বাঁচিয়ে রাখেতে চান সমাজে। এমন প্রত্যাশা নিয়েই তার পথচলা যেন থেমে নেই। যে টুকু প্রতিভা আছে সেটুকু কাজে লাগিয়ে নিজেকে একজন কৌতুক অভিনয় শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন তার। এমন নানা প্রত্যাশা আর স্বপ্ন নিয়েই তৈরী আমিরুলের গল্প।
খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার সামন্তসেনা পাঁচআনি গ্রামে ১৯৮৩ সালে জন্ম হয়েছিল আমিরুল ইসলামের। পিতা মরহুম মোজাহার চোকদার ও মাতা সাহিদা খাতুন। পিতার ক্ষুদ্র ব্যবসার কারণেই নগরীর নতুন বাজারে আমিরুল ইসলামের বসবাস গড়ে উঠে। পিতার ব্যবসায় ভাটা পড়ার কারণে ছোটবেলা থেকেই আমিরুলকে চলতে হয়েছে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে। যেটি হালে সরকারি হয়েছে। ছোট বেলা থেকে আমিরুল ইসলাম শিক্ষা জীবন থেকে ঝরে পড়তে বাধ্য হন পিতার অভাবের কারণে। জীবন ও জীবিকার তাগিদে ছুটতে হলো কাজের সন্ধানে। কিন্তু এই বয়সে কি আর কাজ মেলে? সংসারের অভান থাকলেও ছোটবেলা থেকেই কৌতুক অভিনেতা হবার ইচ্ছাকে যেন হার মানাতে পারেনি আমিরুলকে। এজন্য তিনি ছুটে বেড়াতেন বিভিন্ন যাত্রা অনুষ্ঠানে। কাজ না পাওয়া আমিরুল তাই চলচ্চিত্র ও যাত্রাপালায় কৌতুক অভিনেতাদের অভিনয় দেখাতে শুরু করলেন আর রপ্ত করতে থাকলেন অভিনয়ের কলা কৌশল।
কথা প্রসঙ্গে আমিরুল বললেন, একদিন খুলনার নাট্য পরিচালক মোহাম্মদ হোসেনের সাথে তার পরিচয় ঘটে। তখন তিনি বিভিন্ন যাত্রা পালার পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। তার হাত ধরেই আমিরুল ইসলাম যাত্রা অঙ্গনে প্রবেশ করেন। শহর ও প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের যাত্রা মঞ্চে কৌতুক অভিনেতার অভিনয় করে প্রশংসা অর্জন করলেন। এভাবে তিনি ২০০১ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন যাত্রাপালা ও নাটকে অভিনয় করেন। তিনি যেসব যাত্রাপালায় কৌতুক অভিনেতা হিসেবে অভিনয় করেছেন তার মধ্যে উলে­খযোগ্য হচ্ছে সংসার আদালত, মায়ের চোখের জল, জেল থেকে বলছি, চন্দনাকে চাই, যুদ্ধে যাবো, লাল বেনারসি প্রভৃতি।
এরপর এক পর্যায়ে যাত্রাপালা থেকে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিতে থাকে। মানুষ বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে টেলিভিশন, ভিসিআর প্রভৃতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলে যাত্রাপালার মঞ্চে নামে ধ্বস। তখন আমিরুল ইসলাম চাইলেন চলচ্চিত্র জগতে কৌতুক অভিনেতা হিসেবে অভিনয় করবেন। অভিনয় করতে চাইলেই তো অভিনয় করা যায় না। তারপরও আশায় বুক বাঁধলেন আমিরুল।
প্রসঙ্গক্রমে তিনি জানালেন, কিছু দিন তিনি একটি ভিডিও দোকানে মাসের পর মাস বিনা বেতনে চাকরি করেছেন। উদ্দেশ্য ছিল দোকানে বসে বিভিন্ন ছায়াছবি দেখে কৌতুক অভিনয় শেখা। একদিন আমিরুল চললেন ঢাকায়। চলচ্চিত্র অঙ্গনের কোন লোকের সাথে তার কোন পরিচয় নেই। কি করবেন ভেবে কুল পেলেন না। ফিরে আসলেন আবার খুলনায়। এভাবে মাঝে মধ্যে ঢাকায় গিয়ে কন্ধান করতে থাকলেন চলচ্চিত্র অভিনেতাদের। হঠাৎ পরিচয়ও ঘটল কয়েকজনের সাথে। পরিচয় ঘটে নায়ক রাজ রাজ্জাকের সাথেও। আশা সফল হলো ২০১৬ সালে এসে। আমিরুল ইসলাম প্রথাম একটি ছায়াছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পান। অনন্য মামুন পরিচালিত ভালবাসার গল্প নামক ছায়াছবিতে কৌতুক শিল্পী হিসেবে অভিনয় করেন তিনি। এরপর ওয়াকিল আহমেদ পরিচালিত ‘কত স্বপ্ন কত আশা’ ছবিতে কৌতুক শিল্পী হিসেবে অভিনয় করেন।
আমিরুল ইসলাম জানালেন, আধুনিক চলচ্চিত্র নির্মাণে এগিয়ে আসলেই এর উন্নয়ন ঘটবে। আবারও সিনেমা হলগুলো সরগরম হবে।
নতুন নতুন ছায়াছবির শিল্পী বেরিয়ে আসবে। আকাশ সংস্কৃতির কবলে পড়ে আজকের যুব সমাজকে ধংসের দিকে ঠেলে দেয়া হলেও সিনেমার মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে উলে­খ করে কৌতুক শিল্পী আমিরুল ইসলাম বলেন, নতুন নতুন ছায়াছবি নির্মানের ওপর গুরুত্ব দেয়া দরকার। তিনি বর্তমানের চলচ্চিত্র অঙ্গনের নিরাশার মধ্যেও আশার আলো দেখছেন।
তিনি যদি চলচ্চিত্র অঙ্গনে ভালোভাবে প্রবেশের সুযোগ পান তাহলে তিনি কৌতুক অভিনয় শিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানুষের মনোরঞ্জন সক্ষম হবেন বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন। খুলনার একটি স্থানীয় পত্রিকায় ফটো সাংবাদিক হিসেবেও আমিরুল ইসলামকে দেখা যায়। তবে তার মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে কৌতুক শিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা।
অবশ্য এ পর্যন্ত যেসব চলচ্চিত্র নির্মাতা তাকে অভিনয়ের সুযোগ দিয়েছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে আমিরুল ইসলাম জানিয়েছেন তার মূল্য লক্ষই হচ্ছে কৌতুক অভিনেতা, বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদি’র পরিচালক হানিফ সংকেতের সাথে সাক্ষাত
১৯৯১ সালে জনপ্রিয় নাট্য পরিচালক মোহাম্মদ হোসেনের পরিচালনায় মঞ্চ নাটকে অভিনয় করেন। এনাটকে অন্য যারা অভিনয় করেন এরা হলেন আতিয়ার রহমান, সুরত আলী, ময়না ভাবী, ওয়াজেদ আলী, গোলাম মোস্তফা, রামকৃষ্ণ, লতাদি শহিদুল ইসলাম, মোল্লা আলী আহমেদ। ১৯৯৮ সালে খুলনা থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে চলচ্চিত্রে অংশ নেয়ার উদ্যোগ নিলে কৌতুক সম্রাট মরহুম দেলদারের মাধ্যমে আমিরুল যোগাযোগ করেন। বদলা নেব ছবির প্রোযাজক মরহুম সুলতান আহমেদের মাধ্যমে তিনি যোগাযোগ করেন। মহল­া মাস্তান ছবি নামে একটি ছবিতে আমিরুলের অভিনয় করার কথা থাকলেও সুলতান আহমেদ মারা যাওয়ার কারণে এই ছবিটির আর কাজ হয়নি। ১৯৯২ সালে খুলনা দৈনিক পূর্বাঞ্চল পত্রিকার বিশেষ সংখ্যায় আমিরুলের সাক্ষাতকার প্রকাশিত হলে তার জনপ্রিয়তা আরও বেড়ে যায়। এক সময় খুলনা বেতারসহ একাধিক মঞ্চে তার জনপ্রিয়তা ছিল। ১৯৯৮ সালের খুলনা সুন্দরবন সরকারি কলেজে বিটিভির জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে সংগীত শিল্পী নকুল কুমার বিশ্বাসের সাথে যোগাযোগ করেন। ১৯৯২ সালে খুলনার জিয়া হলের উদ্বোধন করার সময় বিটিভির জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদির পরিচালক হানিফ সংকেত দেখার জন্য পাগলের মত ছুটে যান। ২০১৩ সালে রূপসা ভৈরব পুনরায় ইত্যাদির পরিচালক হানিফ সংকেতের সাথে দেখার করার জন্য ছুটে যান। আমিরুল ছোট বেলা থেকে হানিফ সংকেতের নামে সাধনা করে আসছে। অপেক্ষায় আছেন কখন তার গুরু তাকে ডাকবে। ২০১৪ সালে পরিচালক বদিউল আলম খোকন, প্রযোজক নাসির উদ্দিন জিল­ুর মাধ্যমে যোগাযোগ করেন।
অনন্য মামুন পরিচালিত ভালবাসার গল্প ছবির নায়ক মিলনের সাথে প্রথম ছবিতে পা রাখেন। অকিল আহমেদ পরিচালিত কত স্বপ্ন কত আশা নায়ক বাপ্পি, নায়িকা পরিমনির সাথে একটি ছবির সুটিং চললেও ছবিটি এখন মুক্তি পায়নি। নায়ক রাজ রাজ্জাক তার বড় ছেলে বাপ্পারাজ, ছোট ছেলে সম্রাটের সাথে তার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আমিরুল ঢাকায় যেয়ে নায়ক রাজ্জাকের সাথে দেখা করেন। বর্তমান চলচ্চিত্রের নির্মাতা, প্রযোজক শিল্পী কলা কৌশলীদের সাথে আমিরুলের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আমিররুল বলেন, আমাকে বাংলা চলচ্চিত্রের কয়েকজন পরিচালক তাদের ছবিতে কাজ করার সুযোগ দেওয়ায় তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। এক সময় যেমন গ্রাম বাংলার মানুষকে নাট্য মঞ্চে হাসাতাম এবার হাসাবো সিনেমার পর্দায়। সালাহ উদ্দিন লাভলুর চান্দা ফকিরের ভাগে নামে একটি নাটক করার জন্য আমিরুল সুপারিশ করছে। সে সকলের কাছে দোয়া চান। বর্তমানে তিনি ফটোসাংবাদিক হিসেবে কর্মরত আছেন। ২০১৭ সালে শিল্পী মিলন মেলায় যোগ দেন এ সময় এটিএম শামসুজ্জামান, মিশা সওদাগার, নায়ক সোহেল রানা, রোজিনা, নতুন, রিয়াজ, পরিচালক শাহআলম কিরণ, রুবেল, জাহিদসহ একাধিক নায়ক নায়িকাদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাত করেন। বর্তমান সরকার চলচ্চিত্রের আধুনিক চলচ্চিত্র হিসেবে উপহার দিচ্ছেন বলে তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বর্তমানে আমিরুল খুলনায় ফটোসাংবাদিক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। আমিরুলকে চলচ্চিত্রে যখন সুযোগ পেল বাংলা চলচ্চিত্রে জায়গা করে নিতে পারবে বলে আশা রাখে। গত ৫ মে শিল্পী সমিতির নির্বাচনে নায়ক ফারুক ও নায়িকা রোজিনা কৌতুক সম্রাট টেলিসামাদ নায়িকা অরুণ বিশ্বাস, নায়ক সেলিম খান নায়ক রিয়াজ, নায়ক আলী রাজ, নায়িকা নতুন, নায়িকা জিন্নাত সহ সকলের সাথে আমিরুল দেখা করেন। দীর্ঘ দিন পর চলচ্চিত্রে শিল্পী সমিতির নির্বাচনে নায়ক নায়িকাদের দেখার জন্য লাখো লাখো মানুষের ভীড় পড়ে যায়।