কেএমপি’র সাফল্য : যেভাবে হারিয়ে যাওয়া শিশু ইয়ামিন ফিরে পেলো পরিবারকে

0
15

টাইমস রিপোর্ট
রাত আনুমানিক ৯:০০ টা। ছলছল চোখ নিয়ে উদভ্রান্তের মত বসে আছে বছর সাতেক হবে একটা বাচ্চা ছেলে। চারপাশে মানুষের জটলা। দোকানী বিরক্ত হচ্ছেন। দোকান বন্ধ করবেন। কিন্তু, বাচ্চা ছেলেটাকে নিয়ে কি করবেন, সেটা ভেবে মহাদুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিনি। ছেলেটাকে ফেলে চলে যাবেন তাও পারছেন না। মায়া ভরা দুইটা চোখ নিয়ে বাচ্চাটা তাকায়ে আছে। কিছু বলেও না। খাচ্ছেও না। কোথা থেকে এসেছে আর যাবেই বা কোথা, কিছুই বলে না। মহা মুশকিল। রাত বাড়ছে। খুলনার গল্লামারী এলাকায় বলতে গেলে ভালোই রাত হয়ে গেছে। অবশেষে দোকানদারের মাথায় বুদ্ধি খেলে গেলো। রাস্তার টহল পুলিশকে দেখে দৌড়ে গিয়ে জানালো সব কথা। একটা বাচ্চা ছেলে এসে তার দোকানে অনেকক্ষণ বসে আছে। নাম বলছে ইয়ামিন। বাবার নাম সাইফুল। এর বেশী আর কোন কিছুই সে বলে না। কিছু জিজ্ঞেস করলেই বলে মার কাছে যাবো।
যাইহোক, খুলনার হরিণটানা থানার টহল গাড়ি বাচ্চাটাকে সাথে নিল ঠিকই, কিন্তু কি করবে কেউ ই কিছু বুঝতে পারছে না। পার্টি ইনচার্জ এস আই মাসুম বিল্লাহ তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টা ওসি হরিণটানাকে জানালেন। ওসি মনিরুল ইসলাম সব শুনে ভাবলেন বিষয়টা অন্য রকম। সাথে সাথেই আমাকে ফোনে জানালেন। আমি তিন সন্তানের জনক। বাচ্চাকাচ্চা দেখলেই আমার পিতৃসুলভ মনটা নরম হয়ে যায়। পুলিশের চাকরি করি। প্রায়ই বাচ্চাদের সাথে দেখা হয় না। তাই রাস্তায় বাচ্চা দেখলেই আমার নিজের বাচ্চাদের আদুরে মুখগুলো মনে পড়ে যায়। আমি সাথে সাথেই ওসিকে বললাম- আপাতত বাচ্চাটাকে থানায় নিয়ে খেতে দাও। আদর করো। সাহস দাও। যেহেতু বাচ্চা ছেলে, নারী পুলিশ সদস্যদেরকে আপাতত ওর দেখভাল করতে বলো। তাদের দেখলে হয়তো তার মায়ের কথা মনে পড়বে। তখন হয়তো কিছু কথা বলবে। যেই কথা সেই কাজ। হরিণটানা থানায় রাতটা থাকার ব্যবস্থা হল। আমি সকালে ভাবলাম, আবার বাচ্চাটার খোঁজ নেই। নিশ্চয়ই তার বাড়ির কথা কিছু মনে পড়েছে। কিন্তু খুবই হতাশ হলাম। শিশু ইয়ামিন কিছুই বলতে পারে না। শুধু বলে ঢাকার কমলাপুর থেকে এসেছে। কিভাবে এসেছে, বলতে পারে না। তবে শুধু বলে আমি মার কাছে যাবো।৷ মাকে নিতে এসেছি।
নিরুপায় হয়ে গেলাম। ঢাকা কমলাপুরসহ আশেপাশের সমস্ত থানায় ছবিসহ বার্তা প্রেরণ করা হল। কোন মিসিং জিডিও পাওয়া গেল না। অবশেষে ওসিকে বলে উপজেলা সমাজসেবা অফিসারের সাথে যোগাযোগ করে তাকে পাঠানো হল বটিয়াঘাটা শেখ রাসেল শিশু প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে। তারা অত্যন্ত আন্তরিক ছিলেন। সাদরে গ্রহণ করলেন ইয়ামিনকে। আর করবেনই বা না কেন। জুলজুল চোখে ও যখন তাকিয়ে থাকে পৃথিবীর যেকোন মাতা পিতার হৃদয় কেড়ে নিতে তার এক মুহুর্ত সময় লাগবে না। কি নিষ্পাপ, কি আদুরে চেহারা বাচ্চাটার। না জানি তার বাবা মা কতই না খোঁজাখুঁজি করছে তাকে। প্রতিনিয়ত আমি ও আমার সহকর্মীগণ ইয়ামিনের বাড়ির ঠিকানা, স্বজনের হদিস করতে লাগলাম। কিন্তু, ফলাফল শূণ্য। এ যেন খড়ের গাঁদায় সুঁচ খুঁজে চলেছি আমরা। সাব ইন্সপেক্টর মাসুম বিল্লাহ্ও হন্যে হয়ে খুঁজছে বাচ্চাটার পরিবারকে। এর মাঝেই কেটে গেল বেশ ক’টা দিন। গত মাসের ১৯ তারিখ রাতে ইয়ামিন আমাদের অতিথি হয়ে এসেছে আর আজ অবদি তার কোন ঠিকানা মেলেনি। বিষোয়টা ভাবাচ্ছিলো।
হঠাৎ করেই জানতে পারলাম ইয়ামিন বলেছে কমলাপুর রেলস্টেশানে যেখানে ট্রেন ধোয়ামোছা করে তার আশেপাশে গেলে সে চিনবে তার বাড়ি। সেখানে জনৈক বেল্লালের দোকানের লোকজন তাকে চেনে। এই তথ্য জানার পর আর এক মূহুর্ত দেরী করা যায় না। গতকাল অর্থাৎ আট তারিখ ভোরেই সাব ইন্সপেক্টর মাসুম বিল্লাহ আর সমাজ সেবা অফিসের প্রতিনিধিদের একটা টিমকে দিয়ে ইয়ামিনকে পাঠানো হল ঢাকায়। উদ্দেশ্য একটাই, ইয়ামিনের বাবা মায়ের সন্ধান। খুব উৎসাহ নিয়ে রওনা হল আমার টিম। উত্তেজনায় আমি কাজে মনোযোগ দিতে পারছিলাম না। বার বার ফোন করে আপডেট জেনে নিচ্ছিলাম। সকাল ১০:০০ টা নাগাদ আমাদের টিম পৌঁছে গেল কমলাপুর। কিন্তু, কি দুর্ভাগ্য আমাদের। ইয়ামিন ঢাকা গিয়ে আবার সব এলোমেলো করে ফেললো। তালগোল পাকিয়ে ফেলল। বেল্লাল নামের কোন দোকানদারেরও কোন অস্তিত্ব মিলল না। আমি সাময়িক আশাহত হলেও হাল ছাঁড়লাম না। বললাম, ওকে নিয়ে কমলাপুর রেলস্টেশানের চারপাশ ঘুরতে থাকো। যদি কিছু মনে পড়ে। আমার নির্দেশনায় কাজ করতে থাকলো এস আই মাসুম বিল্লাহ আর তার টিম। ঘন্টাখানেক কেটে গেল। কোন নিউজ নাই। হঠাৎই দুপুর আড়াইটা নাগাদ আমার ফোনে মাসুমের ফোন এল-“স্যার ইয়ামিন নারায়নগঞ্জগামী কমিউটার ট্রেন দেখে বলছে এই ট্রেনে আমার বাড়ি যাওয়া যায়।” আমি বললাম-উঠে পড়ো ট্রেনে। ওকে জানালার পাশে বসাও। ও দেখতে দেখতে যাক। আমাদের এত শ্রম অন্তর্জামী বৃথা যেতে দেবেন না নিশ্চয়ই। বাচ্চাকে তার মায়ের কোলে ফেরত আমরা দেবোই। নিষ্পাপ শিশুর কান্না নিশ্চয়ই ¯্রষ্টা দেখছেন।”
দুইটা পঞ্চাশে ট্রেন ছেড়েছে। কিছুক্ষণ পর মাসুম ফোন দিল। ফোনের ওপারে রাজ্য জয়ের উল্লাস। “স্যার ইয়ামিনকে ট্রেনের ভেতর একজন যাত্রী সনাক্ত করেছে। বলছে ওর বাড়ি ফতুল্লার লালপুরে। বাবার নাম সাইফুল। সে আমাদের ওর বাড়ি চিনিয়ে দেবে বলছে।” আমি কিছুক্ষণ কথা বলতে পারলাম না। তারপর বললাম- এগিয়ে যাও। আমি শেষটা দেখতে চাই। ওর বাড়ি পেলে ওর মায়ের কোলে দিয়ে আমাকে ভিডিও কল দেবো। মা ছেলের পুনর্মিলন এর এই মধুর দৃশ্য আমি মিস করতে চাই না।”
ট্রেন থামলো ফতুল্লায়। ইয়ামিন খুশীতে আটখানা। নিজেই পথ চিনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে এ পথ তার চেনা। তাকে অনুসরণ করছে আমার টিম। আমি অধীর আগ্রহে বসে আছি। কাজে মন বসছে না। এক সময় খবর এল ইয়ামিন খুঁজে পেয়েছে তার পরিবার। বাবার নাম সাইফুল। মায়ের নাম মুন্নী। এবার সত্যিই এস আই মাসুম বিল্লাহ ভিডিও কল দিল। আমি প্রস্তুত হচ্ছি ইয়ামিন আর তার মাকে দেখবো বলে। শুনবো তাদের সব কথা। কিন্তু, দেখলাম ইয়ামিনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে মাঝবয়সী একজন মানুষ। ইয়ামিন তার বুকের ভেতর। আমি বললাম – ইয়ামিনের মা কে ফোনটা দাও। মাসুম বলল- স্যার, ইয়ামিনের তো মা নেই। জন্মের পর পরই সে হারিয়েছে তার মাকে। তার বাবা দিন মজুর। পরিবহন শ্রমিক। তিনি আর বিয়ে করেননি। চাচা ফুফুর পরিবারে মানুষ হচ্ছে ইয়ামিন। জ্ঞান হবার পর থেকেই ইয়ামিন তার মাকে খুঁজে ফেরে। সে বিশ্বাস করে না যে তার মা মারা গেছে। কেউ বললে মানতেও চায় না। প্রচন্ড অভিমান করে জেদ করে। তাই সে পথে ঘাটে খুঁজে বেড়ায় মমতাময়ী মায়ের মুখ। মাঝে মাঝেই সে একাই খুঁজতে বেরিয়ে পরে অজানায়। তার বিশ্বাস সে একদিন পাবেই তার মাকে।
আমি আর কিছুই ভাবতে পারছি না। নিজের অজান্তেই চোখের কোন বেয়ে অশ্রæ গড়িয়ে পড়লো। মাদার ইন ম্যানভিলের জেরির কথা স্মরণ হল। এই মা হারা শিশুর শূণ্য বুকের হাহাকার আমাকেও গ্রাস করছে। আমি আর ভাবতে পারছি না। পরম করুনাময়ের কাছে প্রর্থনা করলাম- হে মাবুদ, তুমি ইয়ামিনকে দেখে রেখো।
তথ্যসূত্র : খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ ফেসবুক পেজ

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here