কারও মান ভাঙানোর ইচ্ছা নেই : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

0
507

টাইমস রিপোর্টঃ  আগামী নির্বাচন সামনে রেখে ‘রাজনৈতিক মান-অভিমান’ ভাঙাতে কোনো উদ্যোগ গ্রহণের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, এটা হচ্ছে নীতির প্রশ্ন। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও আইনের প্রশ্ন। দেশের মানুষকে গ্রামপর্যায় পর্যন্ত উন্নয়নের ছোঁয়া দিতে পেরেছি। সেটাই সরকারের সবচেয়ে বড় পাওয়া। এখানে কে মান-অভিমান করলো, কার মান ভাঙাতে হবে- সেটা জানা নেই। তবে সহানুভূতি দেখাতে গিয়ে যদি অপমানিত হয়ে ফিরে আসতে হয়, সেখানে যাবার আর কোনো ইচ্ছা নেই।

বুধবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে এদিন সংসদের বৈঠকে সরকারি ও বিরোধী দলের একাধিক সংসদ সদস্যের লিখিত ও সম্পূরক প্রশ্নের জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী।

জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাস ও মাদকের বিরম্নদ্ধে তার সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করে সংসদ নেতা বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, বিভ্রান্তিকর কিংবা উস্কানিমূলক পোস্ট ও ভিডিও প্রচারকারীকে সনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে সাইবার ক্রাইম মনিটরিং সেল গঠনসহ প্রয়োজনী কার্যক্রম নেওয়া হচ্ছে। কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা দল যাতে গুজব বা বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রচার করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত করতে না পারে- সে বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

সম্পূরক প্রশ্ন করতে গিয়ে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ফখরুল ইমাম বলেন, একটা পিছিয়ে পড়া জাতিকে উন্নয়নে ভাসিয়ে দেওয়ার নাম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশের এত উন্নয়ন হয়েছে, যার রূপকার অবশ্যই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এটা নিয়ে কারোর মনে কোনো প্রশ্ন নেই। তবে দেশে যে রাজনৈতিক মান-অভিমান চলছে এটা ভাঙ্গাতে প্রধানমন্ত্রী কোন উদ্যোগ নেবেন কি না?

এমন প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখানে মান-অভিমানের বিষয়টি কোথা থেকে এলো জানি না। কেউ যদি দুর্নীতি করে, এতিমের টাকা চুরি করে, মানুষ খুন করে, খুন করার চেষ্টা চালায়, গ্রেনেড মারে, বোমা মারে তার বিচার হবে- এটাই তো স্বাভাবিক। রাজনীতি সবাই করে যার যার আদর্শ নিয়ে। আর আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছি বলেই দেশটাকে উন্নত করতে পেরেছি। এখানে কে মান-অভিমান করলো, কার মান ভাঙাতে যাব- সেটা আমি জানি না।

এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, দেশটা কারও একার নয়, আমাদের সকলের। আর দেশ ও জনগণের কল্যাণ করাই একজন রাজনীতিবিদের প্রধান দায়িত্ব। আর আমরা রাজনীতি করি নিজেদের স্বার্থে নয়, নিজেদের লাভ-লোকসানের জন্য নয়। আমরা দেখি জনগণের কল্যাণ ও স্বার্থে। দেশের মানুষকে ভালবেসে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করতে পেরেছি বলেই এত অল্প সময়ে দেশের এত উন্নয়ন করতে সক্ষম হয়েছি। অতীতে অনেক সরকারই ক্ষমতা থাকলেও এত অল্প সময়ে দেশের এত উন্নয়ন কে করতে পেরেছে? কেউ পারেনি। কারণ তারা জনগণের স্বার্থের বদলে নিজেদের গোষ্ঠীস্বার্থ দেখেছে। তাদের কাছে ব্যক্তিস্বার্থ দেশের জনগেণের স্বার্থের চেয়ে বড় ছিল বলেই পারেনি।

আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য মামুনুর রশিদ কিরনের লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হিসেবে বিশ্বে যে সুনাম অর্জন করেছে, তা ধরে রাখতে আওয়ামী লীগ সরকার বদ্ধপরিকর। কোনো গোষ্ঠী কিংবা দল যাতে দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে না পারে সে বিষয়ে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধীদের বিরম্নদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

সরকারি দলের আরেক সংসদ সদস্য বজলুল হক হারুনের লিখিত প্রশ্নের জবাবে সংসদ নেতা জানান, আওয়ামী লীগ সরকার সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করে চলছে। সন্ত্রাস, জঙ্গীবাদ ও দুর্নীতিমুক্ত করার উদ্দেশ্যে সন্ত্রাস, জঙ্গীবাদ ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে ও তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নিতে পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, সবধরনের সন্ত্রাসী, জঙ্গি, দুর্নীতিবাজ ওয়ারেন্টভুক্ত ও সাজাপ্রাপ্ত আসামিসহ নিয়মিত মামলার আসামি গ্রেফতার; অবৈধ অস্ত্র, বিস্ফোরক ও মাদকদ্রব্যসহ সবধরনের অবৈধ মালামাল উদ্ধারের জন্য পুলিশের নিয়মিত বিশেষ অভিযান পরিচালনা এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত আছে। ইতোপূর্বে জঙ্গি, সন্ত্রাসী, দুর্নীতিবাজ, নাশকতা ও মাদকের সঙ্গে সংশিতষ্টতার অভিযোগ রয়েছে এমন ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড ও গতিবিধি সম্পর্কে গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও মাদকের সঙ্গে সংশিতষ্ট সব অপরাধীদের কর্মকাণ্ড রোধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

সরকারি দলের অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিন দফা চুক্তি এবং আশ্বাস দিলেও মিয়ানমার সরকার তাদের নাগরিক রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে তেমন উদ্যোগী হচ্ছে না। কিন্তু বর্তমান সরকারের কূটনৈতিক প্রধান সাফল্যই হচ্ছে আমরা রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিশ্বজনমত সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছি। সারাবিশ্বের নেতারাই একমত পোষণ করে বলেছেন, রোহিঙ্গাদের ওপর অন্যায় করা হয়েছে এবং মিয়ানমার সরকারকে তাদের ফেরত নিতেই হবে।

তিনি বলেন, চীন, রাশিয়া ও ভারতও রোহিঙ্গা ইস্যুতে বলেছে মিয়ানমারের উচিত রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়া। চীন ও ভারত রোহিঙ্গাদের জন্য ঘর-বাড়ি নির্মাণেও সাহায্য দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক আদালতও মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নির্যাতনের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের উদ্যোগ নিয়েছে। বিমসটেক সম্মেলনের সময় মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনার সময়ও তিনি রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবেন বলে জানিয়েছেন। তবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আন্তর্জাতিক চাপের মুখেই মিয়ানমার তাদের নাগরিক রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে বাধ্য হবে।

জাতীয় পার্টির নুরুল ইসলাম মিলনের প্রশ্নের লিখিত জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত বিপুল রোহিঙ্গা জনস্রোতের নজিরবিহীন এক মানবিক সঙ্কটে বাংলাদেশ সক্রিয়ভাবে সাড়া দিয়ে সীমান্ত্ম উন্মুক্ত রেখে তাদের প্রবেশ করতে দিয়েছে। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদে অবস্থানের কোন সুযোগ নেই। আমরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে চাই। আওয়ামী লীগ সরকারের গৃহীত কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলে, রোহিঙ্গাদের নিজ মাতৃভূমিতে নিরাপদ, সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসন সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।

সরকার দলীয় সংসদ সদস্য এম এ মালেকের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাজধানী ঢাকার যানজট নিরসনে মহানগরীর চারপাশে এলিভেটেড রিং রোড করা হবে। এছাড়া পাতাল রেল নির্মাণেরও পরিকল্পনা রয়েছে। এর জন্যও সমীক্ষা চলছে। এ প্রসঙ্গে সারাদেশে সড়ক, রেল ও আকাশপথের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

তরীকত ফেডারেশনের সংসদ সদস্য নজিবুল বশর মাইজভান্ডারীর সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, মাত্র সাড়ে নয় বছরে তার সরকার দেশের যত উন্নয়ন করেছে, তা বলতে গিয়ে টানা কয়েকদিন সময় লাগবে। একদিনে বলে শেষ করা যাবে না।