একজন সাবেক এমপি ও বর্তমান রাজনীতি

0
958

মো. জয়নাল ফরাজী:

ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে সারাজীবন গণমানুষের রাজনীতিতে নিবেদিতপ্রাণ বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ইউসুফ। যিনি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া আসনের সাবেক সংসদ সদস্য। দেড় দশক ধরে প্রায় বিনা চিকিৎসায় শয্যাশায়ী হয়ে থাকলেও এই রাষ্ট্রের কাছে শুধু অবহেলাই পেয়েছেন তিনি। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মাসিক ভাতা পেলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে তার চিকিৎসার কোনো খোঁজ নেওয়া হয়নি। ১৭ বছর ধরে বড় ভাইয়ের দেখাশোনা করছেন এই সাবেক এমপির ছোট ভাই মো. সেকান্দর। ছোট একটি চায়ের দোকানের উপার্জন দিয়ে পরিবারের ব্যয় নির্বাহের পাশাপাশি তিনি তার দেখাশোনা করেন।

২০০১ সালে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে চলৎশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকে রাঙ্গুনিয়া পৌর সদরের কলেজ রোডে ভাইয়ের বাসায় শয্যাশায়ী হয়ে রয়েছেন। সবশেষ সপ্তাহখানেক আগে হাঁটাচলার শক্তি একেবারেই হারিয়ে ফেলেছেন। কলেজ রোডের একটি দুই তলা ভবনের নিচতলায় একটি তিন কক্ষের ছোট বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন সেকান্দর। ওই বাসার একটি কক্ষ বরাদ্দ ইউসুফের জন্য। কক্ষটিতে ছোট একটি চৌকির মধ্যে নির্বাক শুয়ে থাকেন তিনি।

তিন ভাই-তিন বোনের মধ্যে সবার বড় ইউসুফ সারাজীবন ছিলেন রাজনীতি অন্তঃপ্রাণ, বিয়ে করেননি তিনি। রাঙ্গুনিয়া থানা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি থাকার সময় ১৯৬৯-৭০ সালে রাঙ্গুনিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি (ভিপি) ছিলেন। স্বাধীনতার পর শ্রমিক রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পর ১৯৭৪-৭৫ মেয়াদে দাউদ-ফোরাত জুটমিলে সিবিএ সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সালে। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) রাঙ্গুনিয়া থানার সাবেক সভাপতি ইউসুফ জেলা কমিটির সদস্য এবং উত্তর জেলা কমিটির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্যও ছিলেন। ১৯৯১ সালে আট দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে নৌকা প্রতীক নিয়ে চট্টগ্রাম-৭ আসনে নির্বাচন করেন মো. ইউসুফ। বিএনপি প্রার্থীকে পরাজিত করে ৩৪ হাজার ৬১৫ ভোট পেয়ে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। পরে আওয়ামী লীগে যোগ দেন ইউসুফ।

উনি অত্যন্ত সাহসী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। একাত্তরের ২৭ অক্টোবর কেলিশহর ভট্টাচার্য্য হাট অপারেশন, ২২ নভেম্বর ধলঘাট রেললাইন উড়িয়ে দেওয়া এবং ৯ ডিসেম্বর গৈরলার টেক অপারেশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন ইউসুফ।

সারাজীবন শ্রমিক আর গরীব মানুষের সাথে রাজনীতি করেছেন তিনি। ২০০১ সালে ব্রেইন স্ট্রোক করার পর থেকেই তিনি অসুস্থ। ওনার এই পরিণতি দেখে হয়ত কোনো স্বচ্ছ ও সৎ রাজনৈতিক নেতাকর্মী সৃষ্টি হবে না। যেখানে একজন সাবেক এমপির এ অবস্থা সেখানে সাধারণ নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের কি অবস্থা? পুঁজিবাদী রাজনীতির কাছে একজন সৎ আদর্শবান রাজনীতিকের করুণ পরাজয়ের নমুনা মাত্র। এভাবে দেশে আওয়ামী লীগের সৎ আদর্শবান হাজার হাজার ইউসুফ ভাই ধুঁকে ধুঁকে মরছে সুবিধাবাদীদের ভিড়ে।

মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সাংসদ ইউসুফের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সংবাদ মাধ্যম দেখে দেরিতে হলেও তার যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভাবতে অবাক লাগে ক্ষমতাসীন দলের একজন সাবেক এমপি চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর মুখে। অথচ এ বিষয়ে সেই আসনের সংসদ সদস্যের ভূমিকা এখনো প্রশ্নবিদ্ধ। দেশের প্রধানমন্ত্রীর যদি এ রকম বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা লাগে তাহলে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও দলীয় নেতাদের দরকার কি? তারা কি সুবিধাবাদীদের নিয়ে চেয়ার ঠিক রাখার কাজে ব্যস্ত। নাকি দলীয় চাটুকারী করে মনোনয়নের তদবিরে ব্যস্ত?

লেখক: সাংবাদিক, দক্ষিণাঞ্চল প্রতিদিন, খুলনা।