উন্মোচন হয় না আত্মহত্যার রহস্য : প্রয়োগ নেই আইনেরও

0
443

কামরুল হোসেন মনি:
মাসুদুল হাসান। নগরীর খালিশপুর থানাধীন বাস্তুহারা এলাকার বাসিন্দা। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ফেসবুকের মাধ্যমে নিগাত সাথী নামে এক বিবাহিত মেয়ের সাথে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন। ওই সময় মেয়েটি স্বামীর সাথে ইংল্যান্ড প্রবাসী। নগরীর কাশিপুরের স্থানীয় এক প্রভাবশালী বাসিন্দার মেয়ে। ওর সাথে প্রেম থাকা অবস্থায় মেয়েটি ইংল্যান্ড থেকে বাংলাদেশে চলে আসে। এরপর দুইজনই আরও অন্তরঙ্গভাবে দেখা-সাক্ষাৎ করতে থাকে। বিষয়টি জানাজানি হয়। মেয়েটি শেষ পর্যন্ত ছেলের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা শুরু করে। বিষয়টি মেনে নিতে না পেরে ২০১৮ সালে ৩১ জানুয়ারি ঢাকার উত্তরার জামতলা এলাকায় ভাড়া বাসাতে মাসুদুল হাসান গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেন। ছেলেটির আত্মহত্যার পেছনে ওই মেয়েটি দায়ি থাকলেও প্রভাবশালীর কারণে মুখ খুলতে চায় না কেউ।
মাসুদুলের মতো অনেকেই আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেও এই রহস্য উন্মোচন হয় না, অনেক সময় প্রভাবশালীর কারণে বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যায়। দেশে আত্মহত্যা প্ররোচিত আইন থাকলেও তা অনেকের অজানা আবার জানা থাকলেও আইনের আশ্রয় নিতে চান না।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে সূত্রে জানা গেছে, খুলনা জেলায় চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত পুরুষ ও মহিলা মিলে ২৯ জন আত্মহত্যা করেন। এর মধ্যে মেয়ের সংখ্যা ১৩ জন। আত্মহত্যাকারীদের বয়স ১৬ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে হবে। এছাড়া খুলনা সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সূত্র মতে, আত্মহত্যা প্রচেষ্টায় গত দুই মাসে (ডিসেম্বর-জানুয়ারি) ২১ জন রোগী চিকিৎসা সেবা নিয়েছেন। যাদের বয়স ১৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। বেশিরভাগ সময়ই দেখা যায় আত্মহত্যার চেষ্টা করে যারা ব্যর্থ হয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া হয় না। অথচ আত্মহত্যা চেষ্টাকারীর শাস্তি দন্ডবিধির ৩০৯ ধারায় এক বছর কারাদন্ডের কথা বলা হয়েছে। এর সঙ্গে সঙ্গে আত্মহত্যায় সহায়তা বা প্ররোচনাকারীকেও ৩০৬ ধারা অনুযায়ী ১০ বছরের কারাদন্ডের বিধান রয়েছে। সংশ্লিষ্টরাও এরকম মনে করছেন, আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকাও আত্মহত্যা প্রবণতা বৃদ্ধির জন্য অনেকাংশে দায়ি।
খুলনা মেডিকেল কলেজ ও সদর হাসপাতালে সূত্র মতে, ওই সব আত্মহত্যার পেছনে মানসিক সমস্যা, বিষণœতা, হতাশা, মাদকাসক্তি; আর্থ-সামাজিক সমস্যার মধ্যে রয়েছে পরীক্ষায় অকৃতকার্যতা, প্রেমে ব্যর্থতা, শারীরিক অসুস্থতা, বেকারত্ব ইত্যাদি। তারা গলায় ফাঁস, কিটনাশক পান, মাত্রাতিরিক্ত ওষুধ সেবন, ধারালো অস্ত্র দ্বারা আঘাত, পানিতে ডুব দেওয়া, চলন্ত ট্রেন বা বাসের সামনে ঝাঁপ দেওয়া ও শরীরে আগুন লাগানো।
বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা খুলনার কো-অর্ডিনেটর অ্যাডভোকেট মোমিনুল ইসলাম বলেন, মঙ্গলবার আত্মহত্যা চেষ্টাকারী যদি বেঁচে যায়, তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা থাকলেও খুলনায় এ ধরনের কারো বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ হয়নি। আর আত্মহত্যা প্ররোচনাকারী অনেক মামলা হয়েছে, দোষীদের সাজাও দিয়েছেন বিজ্ঞ বিচারক। তিনি বলেন, নগরীতে গৃহবধূ সোনিয়া আত্মহত্যা প্ররোচনার অভিযোগে সোনিয়ার মা বাদী হয়ে থানায় মামলা করেছেন। এটা এখন বিচারাধীন। সম্প্রতি ওই মামলায় ৫ জন আসামির মধ্যে দুইজনকে বাদ দিয়ে আদালতে চার্জশিট প্রদান করেন সংশ্লিষ্ট আইও। এই চার্জশিটের বিরুদ্ধে বাদী আদালতে নারাজি পিটিশন দেবেন।
নগরীর খালিশপুর বাস্তুহারা এলাকার বাসিন্দা মোঃ মাওলানা মাজহারুল ইসলামের ছেলে মাসুদুল হাসান গত ৩১ জানুয়ারি রাত সাড়ে ৮টার দিকে ঢাকা উত্তরা জামতলা বাজারস্থ ৬ তলা ভাড়া বাড়িতে নিজ ঘরে ফ্যানের সাথে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেন। খবর পেয়ে ঢাকার উত্তরা দক্ষিণখান থানার পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। ওই আত্মহত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই আশরাফুল আলম মঙ্গলবার রাতে এ প্রতিবেদককে বলেন, প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি কোন প্রেমঘটিত কারণেই মাসুদুল হাসান আত্মহত্যা করে। ছেলেটির গার্লফ্রেন্ড সাথীর সাথেও কথা হয়েছে। সে বলেছে তার বন্ধু হয়। তবে ছেলেটির একটি আইফোন জব্দ করা হয়েছে। ওটি পাসওয়ার্ড থাকায় এখনো খোলা সম্ভব হয়নি। ওর মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। যদি কোন মেয়ের প্ররোচনায় ছেলেটি আত্মহত্যা করে থাকে তাহলে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আমরা বিষয়টি তদন্ত করে দেখছি। ছেলেটি পোস্ট মর্টেমের রিপোর্ট উপর ভিত্তি করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ হুমায়ুন কবির এ প্রতিবেদককে বলেন, তিনি এই পেশায় রাঙ্গামাটি থাকাকালীন একটি আত্মহত্যা চেষ্টাকারীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এটা বিচারধীন ছিল। বর্তমানে কি অবস্থায় আছে জানা নেই। তিনি বলেন, যদি কেউ আত্মহত্যার চেষ্টা করে বেঁচে যায়, সেক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা রয়েছে। অনেক সময় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে অনেকে চলে যাচ্ছেন। আবার ওই পরিবারের সদস্যরাও বাড়তি ঝামেলা এড়াতে পুলিশকেও সহযোগিতা করেন না।