উন্নয়নে পিছিয়ে পড়ছে খুলনা, দায় কেডিএ’র : কেসিসি মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক

0
390

নিজস্ব প্রতিবেদক:
খুলনা সিটি মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক বলেছেন, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী না হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়ন হতো না। অত্যন্ত গর্বের সাথে আমরা এই কথা বলতে চাই। একমাএ তিনিই একনেকে ও কেবিনেটে বসে খুলনার জন্য কথা বলেন। ২০১৮ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর কেসিসি’র দায়িত্ব নেবার পর আজ প্রায় দুই বছর পার হয়েছে। আমি মেয়র নির্বাচিত হবার পর পদে বসার আগেই প্রধানমন্ত্রী দুটি প্রকল্প- একটি রাস্তাঘাট সংস্কারের জন্য ৬০৭ কোটি ৫৬ লক্ষ টাকা ও আরেকটি জলাবদ্ধতা নিরসনে ৮২০ কোটি ৭৯ লাখ টাকা বরাদ্ধ দেন কেসিসিকে। এছাড়া চলতি বছরের ১৭ নভেম্বর একনেকের বৈঠকে নগরীর আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ৩শ’ ৯৩ কোটি ৬০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেন। ইতোমধ্যে আমরা এই প্রকল্পের কাজ শুরু করেছি। আমরা এজন্য তার কাছে সবাই ঋণী এবং কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
বুধবার (২৪ নভেম্বর) খুলনা প্রেসক্লাবে খুলনা সিটি কর্পোরেশন আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি। এসময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্য-সহ সকল শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। তিনি ২২ খালের দখলদারদের নিজ উদ্যোগে অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নেয়ার উদ্দাত্ত আহবান জানান। উপস্থিত ছিলেন খুলনা জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ হারুনুর রশীদ, কেসিসি প্যানেল মেয়র-১ আমিনুল ইসলাম মুন্না, প্যানেল মেয়র আলী আকবর টিপু ও মেমরী সুফিয়া রহমান শুনু। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন কেসিসি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পলাশ কান্তি বালা, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা, প্রধান প্রকৌশলীসহ উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা।
তালুকদার আব্দুল খালেক জানান, ১৯৬১ সালে কেডিএ প্রতিষ্ঠার আগে খুলনা পৌরসভা বাড়ির প্লান, রাস্তাঘাট, পানি ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা-সহ নগরীর সকল উন্নয়ন কর্মকান্ড সম্পন্ন করতো। তবে এই সংস্থার চলমান কর্মকান্ড দৃশ্যমান উন্নয়ন হচ্ছেই না, বরং কেসিসি তার উন্নয়ন কর্মকান্ডে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। তিনি বলেন, কেডিএ’র বাস্তবায়নাধীন ৫টি আবাসিক এলাকা রয়েছে। এগুলো হচ্ছে, নিরালা আ/এ, মুজগুন্নী আ/এ, সোনাডাঙ্গা আ/এ, ফুলবাড়িগেট আ/এ, দৌলতপুর আ/এ। এছাড়া রাস্তাঘাটের পাশে প্রায় ১০ একর জমি অধিগ্রহণ করে সংস্থাটি বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বরাদ্দ দিয়েছে। এগুলো হচ্ছে- কেডিএ এভিনিউ, জলিল স্মরণী, মজিদ স্মরণী, এমএ বারী সড়ক, কেডিএ এ্যাপ্রোচ রোড, বাস্তহারা হতে সিটি বাইপাস, সোনাডাঙ্গা বাসষ্টান্ড থেকে সিটি বাইপাস, তেলিগাতি কুয়েট থেকে সিটি বাইপাস ও মুজগুন্নী প্রধান সড়ক। সাথে সাথে নিউমার্কেট ও বাসষ্টান্ড করেছে কেডিএ। এখানে খুলনার উন্নয়নের স্বার্থে দায়িত্বশীল ভ‚মিকা রেখেছে তারা।
মেয়র বলেন, খুলনা নগরীর উন্নয়নের মূল দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের। পক্ষান্তরে কেডিএ খুলনার উন্নয়নে কাজ করে। তবে কেসিসি’র সাথে সমন্বয় না রেখে কেডিএ তার উন্নয়ন কাজ করলে শ্রী বৃদ্ধিসহ শহরের উন্নয়ন কঠিন। উদাহরণস্বরূপ বলেন, নিরালা আবাসিক এলাকার জমি অধিগ্রহণ করে তারা প্লট আকারে বিক্রি করেছে। যার মধ্যে বেশিরভাগই ছিল রেকর্ডীয় খাল। সেখানে কোনরকম পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না করে সব জমি তারা বিক্রি করে দেয়। বসবাসকারীদের ময়লা-আবর্জনা ফেলার নির্দিষ্ট স্থান রাখা হয়নি সেখানে। একইভাবে বিনোদনের জন্য নির্ধারিত স্থান নেই। একই চিত্র সোনাডাঙ্গা আবাসিক এলাকার। এসব কারণে বসবাসকারীরা ময়লা ফেলে ড্রেনে কিম্বা কারো না কারো বাড়ির সামনে। একই দূর্ভোগের চিত্র কেডিএ নির্মিত অন্যান্য আবাসিকগুলোর। কেডিএ’র বাস্তবায়নাধীন বাণিজ্যিক স্থাপনার এলাকাগুলোতে নির্ধারিত ময়লা ফেলার স্থান নেই, নেই পানি নিষ্কাষণ ব্যবস্থা।
তিনি জানান, কেডিএ রেকর্ডের খালগুলো ভরাট করেছে। তবে সুচিন্তিত পরিকল্পনা ছাড়াই তারা একের পর একটি প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে। দায়িত্বশীল উন্নয়ন সংস্থার এমন অপরিকল্পিত কাজ আশা করা যায় না। অথচ বারংবার এমন দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিচ্ছে সংস্থাটি। এক্ষেত্রে অবশ্যই কেডিএ প্রকৌশলীদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পানি নিষ্কাষণ ব্যবস্থা রেখে পরিকল্পনামতে প্রকল্প গ্রহণ করার দরকার ছিল। অনেকেই মনে করেন উন্নয়ন মানে সিটি কর্পোরেশন। তবে অন্যের কাজের খেসারত দিতে হয় কর্পোরেশনকে এটাওী সবার জানা উচিত।
মেয়র বলেন, কেডিএ বাস্তবায়নাধীন সড়কে অত্যন্ত নি¤œমানের কাজ করে থাকে, তারপর সেই সড়কের দায়িত্ব কেসিসিকে হস্তান্তর করে। এজন্য সংস্থাটিকে সুস্পষ্টভাবে বলে দিয়েছি, নি¤œমানের কোন কাজই কেসিসি নেবে না। এরমধ্যে সোনাডাঙ্গা বাসষ্টান্ড থেকে বাস্তহারা পর্যন্ত সড়কটি করার পরই সেখানে চলাচল করার অবস্থা ছিল না। ২০১৩ সালে ২৪ কোটি ব্যয়ে রাস্তাটি করা হয়। এরপর দুইবার মেইনট্যানেন্স করা হয়। তবে এখনও তাতে চলাচল অনুপযোগী।
তিনি জানান, বাংলাদেশের সকল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ তাদের নির্মিত মার্কেট ও বাসষ্টান্ড সিটি কর্পোরেশন কিম্বা পৌরসভাকে হস্তান্তর করেছে। এরমধ্যে ব্যতিক্রম শুধু খুলনা। সরকার নির্দেশ প্রদানের পরও তারা এসব হস্তান্তর করছে না। কেডিএ তার রাজস্ব যেখান থেকে আসবে সেগুলো হস্তান্তর করবে না। আবার এসব মেইনট্যানেন্সও করে না। অথচ তাদের দায়িত্ব রাজস্ব আহরণের উৎস বাসষ্টান্ড সংলগ্ন সড়ক উন্নয়ন করা।
তালুকদার আব্দুল খালেক বলেন, কেডিএ’র নতুন রাস্তা থেকে এমএ বারী সড়ক, জলিল স্মরণী ও মজিদ স্মরণী কেসিসিকে প্রদত্ত প্রধানমন্ত্রীর ২শ’ কোটি টাকা থেকে করা হয়। কারণ আমি জনপ্রতিনিধি, জনগণের কাছে আমার জবাবদিহিতা রয়েছে, দাবি রয়েছে। নগরবাসীর দাবির প্রেক্ষিতেই আমি এসব সড়ক উন্নয়ন করেছি। এখন প্রশ্ন কেডিএ’র কাজটা কি? যেখানে কেসিসিই সব উন্নয়ন করছে।
তিনি আরও বলেন, বিদুৎ তার সকল তার মাটির নিচে স্থাপন করবে। এক্ষেত্রে আবার সড়ক খোড়াখুড়ি করা হবে। একইভাবে ওয়াসা তার ১৩শ’ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প’র সেকেন্ড ফেজ কাজ শুরু করবে। এখানে সড়কের খোড়াখুড়ি চলবে। এভাবেই সড়কে বারবার কাজ করা হয়। একইভাবে খালিশপুর হাউজিং এলাকায় মাস্টার প্লান বাস্তবায়ন হবে। অথচ সেখানে প্রায় সবাই বাড়ির সামনে অংশটুকু দখল রেখে স্থাপনা করেছে। এখানে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে সেসব স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে। এভাবে অন্যান্য সংস্থার অনেক কাজের জন্য খেসারত দিতে হয় কেসিসিকে।
মেয়র দু:খের সাথে বলেন, ২০১৮ সালের ২১ মে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একনেকে ৩৯৫ কোটি টাকা ব্যয়ে তিনটি সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প পাস হয়। ২০২১ সালের কাজ শেষ হবার কথা ছিল। অথচ আজ অবধি সেই প্রকল্পর কাজই শুরু হয়নি। এমনকি জমিও অধিগ্রহণ করেনি সংস্থাটি। অথচ নিরালা আবাসিক এলাকা গুরুত্বপূর্ণ স্থান। সেখান থেকে সিটি বাইপাস পর্যন্ত সড়ক হলে যানজন নিরসনের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হতো। এখানেই স্পষ্ট যে, কেডিএ’র জন্য খুলনার উন্নয়ন ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে, পিছিয়ে যাচ্ছে।
মেয়র জানান, ২০১৩ সালের ৭ মে প্রথমবার ৯৮ কোটি ৯০ লক্ষ কোটি টাকার খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প প্রধানমন্ত্রী একনেকে পাস করে দেন। ৭ বছর অতিক্রম হলেও এর কাজ শুরু হয়নি। এরপর একই প্রকল্প দ্বিতীয় দফায় একনেকে ওঠে, ১৬১ কোটি টাকা পাস হয়। এবারও যখন প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি, তখন প্রধানমন্ত্রী চলতি বছরে তৃতীয় দফায় একনেকে ২৫৯ কোটি টাকার প্রকল্প পাস করেন এবং একই সাথে বিরক্ত হন। উল্লেখ্য যে, ২০১৩ সালে এই প্রকল্প পাস হওয়ার সাথে সাথে কেসিসি মেয়র থাকাকালীন আমি শিপইয়ার্ডের সামনে থেকে এগোলে যে সড়ক আছে, সেটা বড় করে দেই।
খালেক বলেন, গল্লামারী থেকে রায়েরমহল পর্যন্ত এবং কৃষি বিশ^বিদ্যালয় হতে রায়েরমহল পর্যন্ত দুটি সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প ২০১৮ সালে একনেকে পাস হলেও তার কাজ শুরু হয়নি। বিগতদিনে আমি মেয়র থাকাকালীন সময়ে ১৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ময়ূরী আবাসিক এলাকা উন্নয়ন প্রকল্প পাস হয়। এর উন্নয়নে কাজ করছে কেডিএ, অথচ সেখানেও যেভাবে উন্নয়ন করার কথা, তা হচ্ছে না। আর তার সামনের সড়কের বর্তমান অবস্থা অত্যান্ত নাজুক, বেহাল। আগামী দিনে এই সড়কে চলাচল পুরোপুরি অনুপযোগী হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
সবশেষে মেয়র হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, আগামী ছয় মাসের মধ্যে উল্লেখিত প্রকল্পের কাজ শুরু না করা হলে আমি খুলনাবাসীকে সাথে আন্দোলনে নামবো।