উগ্রবাদী সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উল্লম্ফন এবং আওয়ামীলীগের সহনশীল গণতান্ত্রিক রাজনীতি-

0
282

৫২’র ভাষা আন্দোলন থেকে ৭১’র মুক্তিযুদ্ধ বাঙালীর সব ঐতিহাসিক অর্জনেই বাঙালী নামধারী কিন্তু মনেপ্রাণে বাঙালীবিদ্বেষী একটি গোষ্ঠী ধর্মের দোহাই দিয়ে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।আওয়ামীলীগের কালজয়ী নেতৃত্বে জন্মগতভাবে মননে ও চিন্তাশীলতায় অসাম্প্রদায়িক সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি বারবারই সকল অপপ্রচার ও বাধা মোকাবিলা করে অসাম্প্রদায়িকতার পতাকাকে উড্ডীন করেছে।১৯৫২’র ভাষা আন্দোলনে আওয়ামীলীগের তৎকালীন সাধারন সম্পাদক শামসুল হক এবং বঙ্গবন্ধু,ছাত্রনেতা দবিরুল ইসলাম সহ তৎকালীন ছাত্রনেতাদের নেতৃত্বে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতারা যখন বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে হামলা,মামলা,গ্রেফতার,নির্যাতন সহ্য করে রাজপথে তখন মাওলানা আকরাম খাঁ,খাজা নাজিমুদ্দিন,নূরুল আমিন সহ মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ বাংলাকে হিন্দুর ভাষা হিসেবে আখ্যায়িত করে ধর্মপ্রাণ বাঙালীদের মধ্যে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করে বাংলা ভাষা আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার অপপ্রয়াস চালায়। হরতাল,অবরোধ,ধর্মঘটের মত গণতান্ত্রিক কর্মসূচীতে সারা বাংলার ছাত্রসমাজকে সম্পৃক্ত করার মধ্য দিয়ে আওয়ামীলীগ ও ছাত্রলীগের নেতৃত্বে বাংলা ভাষার দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলন সফল হয়।পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।৫৪’র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনেও ধর্মের নামে রাজনীতি করা নূরুল আমিন,খান এ সবুর,ফজলুল কাদের চৌধুরী সহ নেতৃবৃন্দ “নৌকায় ভোট দিলে বিবি তালাক হয়ে যাবে” এ ধরণের সাম্প্রদায়িক অপপ্রচার শুরু করে।তবে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী,শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক,মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রতি সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালী আস্থা রাখে।২৩৭ টি আসনের মধ্যে ২২৩ টি আসন লাভ করে যুক্তফ্রন্ট।মুসলিম লীগের এই ভরাডুবির মাধ্যমে প্রমাণিত হয় বাংলার ধর্মভীরু মুসলমানরা মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে সমর্থন করে নি।ধর্মকে পুঁজি করে মুসলিম লীগের অপরাজনীতি এমনভাবে ধাক্কা খেয়েছিল যে পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগ আর কখনই রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দাঁড়াতে পারেনি।পাকিস্তানের রাষ্ট্রকাঠামোর অধীনে বাঙালীর শোষণ,বঞ্চনা,অত্যাচার,নিপীড়নের প্রতিবাদে ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া বঙ্গবন্ধু ৬৬ তে ৬ দফা দাবি উত্থাপন করলে জামায়াত,নেজামে ইসলাম,মুসলিম লীগ ৬ দফাকে পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্র হিসেবে অভিহিত করে।পাকিস্তানের শোষণ,বঞ্চনার প্রতিবাদে এই অপচক্র কোনদিন টুঁশব্দ না করলেও অপশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে তাদের কন্ঠ ছিল সবসময় সোচ্চার।৭০’র ৭ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিজয় ছিল বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের টার্নিং পয়েন্ট। ৭০’র নির্বাচনের বিজয় ছিল বঙ্গবন্ধুর জন্য বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার বৈধ ম্যান্ডেট। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী এবং তাদের এদেশীয় দোসররা বুঝতে পারে নি যে বাংলার ধর্মভীরু সাড়ে সাতকোটি বাঙালী তাদের ভাষায় ইসলামবিদ্বেষী আওয়ামীলীগের পক্ষে এভাবে জনরায় দিবে।তারা মনে করেছিল ধর্মীয় অপপ্রচারই আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে তাদের উপযুক্ত হাতিয়ার। এ কারনে “আওয়ামীলীগকে ভোট দিলে এদেশ ভারতের অঙ্গরাজ্য হয়ে যাবে,মসজিদে আযান বন্ধ হয়ে যাবে,আওয়ামীলীগকে ভোট দিলে ঈমান থাকবে না” এ জাতীয় অপপ্রচার চালিয়েছিল।তবে তাদের এই ধর্মাশ্রয়ী অপকৌশল কাজে আসেনি।মানুষ বঙ্গবন্ধুর গণতন্ত্র,সাম্য ও মানবিক মূল্যবোধ এবং ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালী জাতীয়তাবাদ ভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক নীতির পক্ষে তাদের অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়ে নিরঙ্কুশ বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল।৯১ সাল এমনকি ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের পূর্বেও বিএনপি,জামায়াত একই কায়দায় আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন মনগড়া অপপ্রচার চালিয়েছিল।আওয়ামীলীগের ধর্মনিরপেক্ষতাকে তারা ধর্মহীনতা বলে আওয়ামীলীগকে নাস্তিকের দল হিসেবে মানুষের সামনে উপস্থাপন করেছে।আওয়ামীলীগকে ভোট দিলে দেশ ভারত হয়ে যাবে।মসজিদে আযান নয়,ঊলুর ধ্বনি বাজবে।এমনকি জামায়াতের সদস্য টিকিটকে তারা জান্নাতের টিকেট হিসেবেও তুলনা করেছিল।কিন্তু আওয়ামীলীগ ৯৬-২০০১ ক্ষমতায় ছিল।বাংলার মানুষ দেখেছে বাংলাদেশ ভারত ও হয় নি,মসজিদে আযানের ধ্বনি বেজেছে।আওয়ামীলীগের ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়,বরং যার যার ধর্ম পালনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।২০০৯ থেকে অদ্যাবধি মানুষ দেখছে কারও ধর্ম পালনের স্বাধীনতাকে খর্ব করা হয়নি বরং যার যার ধর্ম পালনের শতভাগ স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করেছে রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার আওয়ামীলীগ সরকার।রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ ব্যয় করে দেশের সব জেলা,মহানগর, উপজেলা ও বিভাগীয় শহরে আধুনিক সুযোগসুবিধা সম্পন্ন দৃষ্টিনন্দন মডেল মসজিদ নির্মাণের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে বঙ্গবন্ধু কন্যার সরকার।কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি এবং মক্তব ও মসজিদভিত্তিক পাঠদান কর্মসূচীর প্রসার ঘটিয়ে এই সরকারপ্রমাণ করেছে ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনীতি করা অতীতের জিয়া,এরশাদ,খালেদা,খালেদা-নিজামী সরকারের চেয়ে শেখ হাসিনার সরকার শতগুণ ইসলামবান্ধব।তারপরও ধর্মভিত্তিক দলগুলোর টার্গেট ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী অসাম্প্রদায়িক আওয়ামীলীগ এবং বঙ্গবন্ধু।অথচ বঙ্গবন্ধুই এদেশে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা।ঘোড়দৌড়,মদ,জুয়া ইত্যাদি নিষিদ্ধ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু।৭০’র নির্বাচনের পূর্বে বেতার ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- “আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করা হচ্ছে আমরা ইসলামে বিশ্বাসী নই।এ ব্যাপারে আমাদের সুস্পষ্ট বক্তব্য- লেবেল সর্বস্ব ইসলামে আমরা বিশ্বাসী নই।আমরা বিশ্বাসী ইনসাফের ইসলামে,যে ইসলাম জগৎবাসীকে শিক্ষা দিয়েছে ন্যায় ও সুবিচারের অমোঘ মন্ত্র।” অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে নিজের ধর্ম পালন সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন-“তখন আমি নামাজ পড়তাম,রোজ কুরআন তেলাওয়াত করতাম।কুরআন শরীফের বাংলা তরজমার কয়েক খন্ড ছিল আমার কাছে।ঢাকা জেলে শামসুল হক সাহেবের কাছ থেকে নিয়ে মাওলানা মোহাম্মদ আলীর ইংরেজী তরজমাও পড়েছি।” মহান রব্বুল আলামীনের উপর বঙ্গবন্ধু কতটা আস্থাশীল ছিলেন,কতটা আল্লাহ্ ভীরু ছিলেন জাতীয় সংসদে বঙ্গবন্ধুর একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করলেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে।২৫ শে জানুয়ারি ১৯৭৫ এ জাতীয় সংসদে বঙ্গবন্ধু বাকশাল সম্পর্কে বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেন-“তাই,আল্লাহর নামে চলুন,আমরা অগ্রসর হয়।বিসমিল্লাহ্‌ বলে আল্লাহর নামে আমরা অগ্রসর হই।ইনশাআল্লাহ্ আমরা কামিয়াব হবই।খোদা আমাদের সহায় আছেন।যদি সকলে মিলে আপনারা নতুন প্রাণে নতুন মন নিয়ে খোদাকে হাজির নাজির করে,নিজের আত্মসংশোধন করে,আত্মশুদ্ধি করে,ইনশাআল্লাহ্ বলে কাজে অগ্রসর হন,তাহলে জানবেন বাংলার জনগণ আপনাদের সাথে আছে।বাংলার জনগণ আপনাদের পাশে আছে;জনগণকে আপনারা যা বলবেন, তারা তাই করবে।আপনাদের অগ্রসর হতে হবে।আমরা কামিয়াব হবই।”বঙ্গবন্ধু,শেখ হাসিনা এবং আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে ধর্মের নামে রাজনীতি করা একটি গোষ্ঠী সবসময় তৎপর।শেখ হাসিনাকে,রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামীলীগকে এবং এর পরিপূর্ণতা ও বিকাশ লাভ যে মহান নেতার নেতৃত্বে তাকে ইসলামবিদ্বেষী প্রমাণ করা যেন তাদের ধর্ম পালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।পৃথিবীর সব মুসলিম রাষ্ট্রে এমনকি যেখানে ইসলামিক শাসনব্যবস্থা বিদ্যমান এ ধরনের সকল রাষ্ট্রেই মানুষসহ বিভিন্ন পশুপাখির ভাস্কর্য আছে।সর্বকালের,সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ(সাঃ)এর জন্মভূমি পূণ্যভূমি সৌদি আরব,ইরাক,ইরান,আরব আমিরাত,আবুধাবি,তুরস্ক,পাকিস্তান,মালয়েশিয়া সহ সব দেশেই স্ব স্ব জাতিরাষ্ট্রের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক হিসেবে বিভিন্ন ধরনের ভাস্কর্য আছে।বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের বাংলাদেশে ও ভাষা আন্দোলন,মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবন্ধুকে নতুন প্রজন্মের মধ্যে তুলে ধরতেই আমাদের সমৃদ্ধ ইতিহাস,ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সাথে মানানসই বিভিন্ন ধরনের ভাস্কর্য আছে।এসব ভাস্কর্য নির্মিত হয়েছে আমাদের সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে,শহর ও নগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টের সৌন্দর্য বর্ধন করতে।অথচ এসব ভাস্কর্যকেই মূর্তির সাথে তুলনা করে একে ইসলামবিরোধী গর্হিত কাজ হিসেবে মানুষের সামনে উপস্থাপন করে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টির মাধ্যমে ধর্মভীরু সাধারন ধর্মপ্রাণ মানুষকে সরকারের বিরুদ্ধে খেঁপিয়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে যা আমাদের সংবিধান পরিপন্থী ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল।বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশেবঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙার হুমকি দিচ্ছে হেফাজত ইসলামের নেতা মাওলানা মামুনুল হক সহ একটি গোষ্ঠী।কুষ্টিয়াতে ইতিমধ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের অংশবিশেষ রাতের আধারে ভাঙা হয়েছে।বঙ্গবন্ধু কন্যা রাষ্ট্রক্ষমতায়,বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া দল আওয়ামীলীগ ক্ষমতাসীন জনগনের নিরঙ্কুশ ম্যান্ডেট নিয়ে।কাজেই সরকার কিংবা আওয়ামীলীগ চাইলেই এই উগ্রবাদী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীকে শক্তি প্রয়োগ করে এদের বিষদাঁত ভেঙে দিতে পারে।কিন্তু আওয়ামীলীগ কোনদিনই শক্তি প্রয়োগের রাজনীতিতে বিশ্বাস করেনা।আওয়ামীলীগ বিশ্বাস করে জনগণের শক্তিতে।ইতিমধ্যেই সারাদেশের ওলিতে,গলিতে আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে শান্তিপ্রিয় উন্নয়নকামী মানুষ রাজপথে নেমে এসেছে উগ্রবাদী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে।জনতার স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ ও প্রতিরোধে মামুনুল গংদের সুর নরম হয়ে এসেছে।যেমনিভাবে ৫২,৫৪,৬৬,৬৯,৭০ ও ৭১ এ বাংলা ও বাংলাদেশবিরোধী শক্তি আওয়ামীলীগ ও বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাজনীতির কাছে পরাজিত হয়েছে,ঠিক একইভাবে ২০২০-এ শেখ হাসিনার উন্নয়ন,শান্তি ও সমৃদ্ধির অসাম্প্রদায়িক,উদার গণতান্ত্রিক রাজনীতির কাছে আমাদের ভাষা,সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধ শক্তি আবারো পরাজিত হবে ইনশাআল্লাহ্।

মোঃ নজরুল ইসলাম, আওয়ামীলীগ নেতা,
১৬ নং ওয়ার্ড আওয়ামীলীগ,খুলনা মহানগর।