ইউএসডিএ-সেফটি প্রকল্প উদ্ভাবিত আধা-নিবীড় পদ্বতিতে চিংড়ি চাষ ও বাংলাদেশের সম্ভাবনা

0
24

-ক‚ষিবিদ সত্য নারায়ন রায়:
মৎস্য পরিসংখ্যান মোতাবেক বাংলাদেশে চিংড়ি চাষের উপযোগি মোট ২ লক্ষ ৫৭ হাজার ৮৮৮ হেক্টর জলাশয় আছে। উল্লেখিত জলাশয়ের মধ্যে খুলনা বিভাগে ২০৩,৭৮৬ হেঃ (বাগদা-১৩৮০২৪, গলদা-৬৫,৭৭২ হেঃ) খামারে ৮৭ হাজার ৪৭ খামারি চিংড়ি চাষের সাথে জড়িত। উক্ত চষিদের প্রায় সবাই সনাতন পদ্ধতিতে বাগদা ও গলদা চিংড়ি চাষ কওে জীবিকা নির্বাহ তথা ভাগ্য পরিবর্তনের সংগে জড়িত। ২০১৯-২০ অর্থ বছরে বাংলাদেশে বাগদা ও গলদা চিংড়ির মোট উৎপাদন হয় ১১৫,৭৮৪ মেট্রিক টন (বাগদা-৬৪,৬৮৮ মেট্রিক টন, গলদা- ৫১,০৯৬ মেট্রিক টন)। উইনরক ইন্টারন্যাশনাল একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা ”ইএসডিএ-সেফটি” প্রকল্পের মাধ্যমে আধা-নিবীড় পদ্বতিতে চিংড়ি চাষের টেকসইমূলক প্রযুক্তি সম্প্রসারনের কাজ করে আসছে। আধা-নিবীড় পদ্বতিতে চিংড়ি চাষের এই প্রযুক্তিসমূহ প্রয়োগ করে বাংলাদেশের মাঝারি ও ক্ষুদ্র চাষিদের চিংড়ি উৎপাদন প্রায় দ্বিগুন করা সম্ভব।
বাংলাদেশের দক্ষিনাঞ্চলে চিংড়ি চাষের উপযোগী ঘেরের বা খামারের অবস্থা, চাষিদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও কারিগরি জ্ঞান, এবং প্রয়োজনীয় উপকরনের সহজলভ্য তা বিবেচনায় ”ইএসডিএ-সেফটি” প্রকল্প চিংড়ি চাষের তিনটি টেকসইমূলক প্রযুক্তি সম্প্রসারনের কাজ করছে যা আমাদের চিংড়ি চাষিরা সহজে প্রয়োগ করতে পারেন। প্রযুক্তিগুলি হলো- ১) যে সমস্ত এলাকায় লবনাক্ততা ১০ পিপিটির উপরে সেখানে ”আধা-নিবীড় পদ্বতিতে বাগদা চিংড়ির একক চাষ”- এই পদ্ধতিতে উৎপাদন শতকে ৪ কেজি বা হেক্টরে ১০০০ কেজি, ২) যে সমস্ত এলাকায় লবনাক্ততা ০ থেকে ১০ পিপিটি সেখানে ”আধা-নিবীড় পদ্বতিতে বাগদা পরবর্তি গলদা চাষ”- এই পদ্ধতিতে উৎপাদন শতকে বাগদা ২ কেজি বা হেক্টরে ৫০০ কেজি এবং গলদা শতকে ২ কেজি বা হেক্টরে ৫০০ কেজি এবং ৩) যে সমস্ত এলাকায় অতি অল্প বা স্বাদু পানি সেখানে ”আধা-নিবীড় পদ্বতিতে গলদা-কার্প মিশ্র চাষ”- এই পদ্ধতিতে উৎপাদন শতকে ৪ কেজি বা হেক্টরে ১০০০ কেজি গলদা ও সংগে ২ কেজি বা হেক্টরে ৫০০ কেজি কার্প উৎপাদন করা সম্ভব। উল্লেখিত প্রযুক্তিতে চিংড়ি চাষির জন্য কোন প্রকার এরেটর প্রয়োজন হয় না। উল্লেখ্য যে, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি হেক্টরে গড় উৎপাদন প্রতি হেক্টওে বাগদা ৩৪৭ কেজি ও গলদা ৭১৩ কেজি ( ২০২০-২০২১)।
চিংড়ি চাষের উল্লেখিত তিনটি প্রযুক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে ছয়টি (০৬) কাজকে অবশ্য করনীয় বিবেচনা করতে হবে। গুরুত্বপূর্ন ছয়টি কাজ ১) চিংড়ি ঘেরের পানির গভীরতা ৩-৫ ফুট রাখা ও তলদেশ কাদা মুক্ত করা, ২) ঘেরের পানি পরিশোধন ও জীবানু মুক্ত করা, ৩) জৈব নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে পানি ও রোগ-জীবানুর সংক্রমন প্রতিরোধ করা, ৪) বাগদার জন্য এসপিএফ পোনা ও গলদার জন্য ভাল হ্যাচারী পোনা সঠিক ঘনত্বে মজুদ করা, ৫) ভাল মানের খাদ্য নিয়মিত ও পরিমিত প্রয়োগ করা এবং ৬) চিংড়ির সুসাস্থ্য ও পানির গুনগত মান নিশ্চিত করা। এরকম আধা নিবীড় পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষে প্রতি একর ঘেওে খরচ হয় গড়ে ১ লক্ষ ৬২,০০০ হাজার টাকা (স্থায়ী খরচ ও পরিচালনা খরচ) এবং সব খরচ বাদ দিয়ে নিট আয় হয় গড়ে ১ লক্ষ ৪০ হাজার ৮০০ টাকা।
গত মৌসুমে সেফটি প্রকল্পের প্রযুক্তি প্রয়োগ কওে পাইকগাছা উপজেলার লতা ইউনিয়নের কবীর গাজী ১৬৫ শতক ঘেওে বাগদা চিংড়ি একক চাষ করে ৭২৫ কেজি ও কপিলমুনি ইউনিয়নের সরোজিত শীল ৬৬ শতকের ঘের থেকে ২৪২ কেজি বাগদা উৎপাদন করেন; ডুমুরিয়া উপজেলার খর্নিয়া ইউনিয়নের সোলায়মান মোড়ল বাগদা পরবর্তী গলদা চাষ করে ৬১ শতক ঘেরে ২৮৩ কেজি, সাগর বিশ^াস ১০২ শতক ঘের থেকে ৩৭৫ কেজি চিংড়ি বিক্রি করেন, আশাশুনি উপজেলার খাজরা ইউনিয়নের দুলাল চন্দ্র বাচার বাগদার একক চাষ করে ৮৫ শতক থেকে ৩৫৮ কেজি ও কুল্লা ইউনিয়নের কামরুল ইসলাম ৪৩ শতক ঘেরে ১৭৮ কেজি চিংড়ি উৎপাদন করেন। অভয়নগর উপজেলার পায়রা ইউনিয়নের পিযুষ মন্ডল গলদা-কার্প মিশ্র চাষ করে ৬৮ শতক ঘের থেকে ২৬৯ কেজি উৎপাদন করে, শ্রীধরপুর ইউনিয়নের মুকুল বিশ^াস ৩৭ শতক ঘের থেকে ১৪২ কেজি গলদা ও কার্প মাছ উৎপাদন করেন।
উইনরক ইন্টারন্যাশনাল ”ইএসডিএ-সেফটি” প্রকল্পের মাধ্যমে ২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশের দক্ষিনাঞ্চলে ১০টি উপজেলায় ২৫,০০০ মাঝারি ও ক্ষুদ্র চিংড়ি চাষিদেরকে জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে উপরেউল্লিখিত চিংড়ি চাষের তিনটি প্রযুক্তি সম্প্রসারনের জন্য নিরলসভাবে কাজ করছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশ মৎস্য অধিদপ্তর ও বাস্তবায়নকারী সহযোগি সংস্থাসমূহ যথেষ্ঠ সহযোগিতা কওে যাচ্ছে। উল্লেখিত প্রযুক্তিসমূহ অধিক সংখ্যক চাষির নিকট পৌছানো গেলে প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ১ থেকে দেড় লক্ষ মেট্রিক টন আধিক চিংড়ি উৎপাদন করা সম্ভব।
পাইকগাছা উপজেলার সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জনাব পবিত্র কুমার দাস বলেন ”ইএসডিএ-সেফটি” প্রকল্প অত্র এলাকার চিংড়ি চাষিদেরকে প্রচুর পরিমানে ব্যবহারিক প্রশিক্ষন ও প্রদর্শনী খামার স্থাপনের মাধ্যমে জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধি এবং চিংড়ি চাষের উপকরনসমূহের সহজ প্রাপ্যতার জন্য স্থানীয় খুচরা বিক্রেতাদের সংগে ডিলার ও চাষিদের যোগাযোগ স্থ্াপনের কাজ করছে। এছাড়াও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি মৎস্য কর্মকর্তাদেরকে চিংড়ি চাষের প্রশিক্ষন প্রদানসহ চিংড়ি সেক্টরে বিশেষ অবদান রাখছে। সেফটি প্রকল্প উদ্ভাবিত আধা-নিবীড় পদ্বতিতে চিংড়ি চাষের টেকসইমূলক প্রযুক্তি বাংলাদেশের মাঝারি ও ক্ষুদ্র চিংড়ি চাষিদের জন্য খুবই উপযোগী।
লেখক পরিচিতি:
রিজিওনাল কো-অর্ডিনেটর, ইউএসডিএ-সেফটি প্রকল্প, উইনরক ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ,ইমেইল: sattya.roy@winrock.org; sattyaroy@gmail.com

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here