আইলা’র ক্ষতচিহ্ন এখনও চোখে ভাসে

0
951

আজিজুর রহমান,দাকোপ :
আজ ২৫ মে আইলা’র ৯ বছর পূর্ণ হলো। এ দিনটি এলে উপজেলার ৩২ নম্বর পোল্ডার সুতারখালী ও কামারখোলা ইউনিয়নের মানুষের চোখে ভাসে সেদিনের সর্বনাশা ঝড়ের দুঃসহ স্মৃতি। প্রকৃতি বিরূপ হলে যখন তখন পৃথিবীলয় হতে পারে তা সেদিনের ভুক্তভোগীরা হাড়েহাড়ে টের পেয়েছে।
২০০৯ সালের ২৫ মে প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড় আইলা আঘাত হানে খুলনার দক্ষিণ-পশ্চিম উপকুল অঞ্চালে। বেলা আড়াইটার সময় ওয়াপদার বাঁধ ভেঙ্গে চোখের নিমিশে প্লাবিত হয় দাকোপ উপজেলার কামারখোলা ও সুতারখালী ইউনিয়ন। শিবসা ও ঢাকি নদীর স্রোতের তোড়ে হারিয়ে যায় অনেকের জমি-জমা ও ভিটে-মাটি। সারা জীবনের তিলে তিলে গড়া সহায়সম্বল হারিয়ে ৯৫ শতাংশ পরিবার ওয়াপদার রাস্তার উপর আশ্রয় নেয় খোলা আকাশের নীচে। বন্যায় বাড়ি ঘর ডুবে যাওয়ার পর সেদিন রাতে পরিবার নিয়ে আশ্রয় হয় ট্রলারে। সারা রাত ছিল ঝড়ো হাওয়া ও বৃষ্টি। ভোর বেলা ট্্রলার থেকে নেমে এসে রাস্তায় আশ্রয় নিয়ে থাকি। তখন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় খাবার পানি ও পায়খানার ব্যবস্থা। সকলে বাধ্য হয়েছিল তখন ঝুলান্ত পায়খানায় পায়খানা করতে। দুর্গন্ধময় পরিবেশে থেকে এখানকার মানুষ প্রতিনিয়ত কঠিন রোগের শিকার হয়েছে। ধনী গরিব সকলেই হয়ে পড়ে তাৎক্ষনিকভাবে হতদরিদ্র। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের অভাবে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে। ঘর-বাড়ি ছেড়ে ৪০ হাজারের বেশী মানুষ পানি বন্দি হয়ে রাস্তার উপর ঝুপড়ি বেঁধে কোনো রকমে বসবাস করতে থাকে। সেদিন সাহায্যের জন্য পাশে এসে দাঁড়ায় সরকারি ও বে-সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। আইলা আক্রান্ত মানুষদের খাদ্য, বস্ত্র দিয়ে বাঁচিয়ে রাখে তারা। এমন সব কথা বলছিলেন সুতারখালী গ্রামের ৭৯ বছর বয়সের বৃদ্ধা আব্দুল মান্নান গাজী।
তিনি আরও বলেন, এলাকায় কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায়, কর্মসংস্থানের জন্য বাড়ীর কর্তারা পরিবার রেখে চলে গিয়েছিল দেশের দূর-দুরান্তে। অনেকে আবার সুন্দরবনে মাছ, কাঁকড়া ধরে জীবনযাপন করত। একেত রাস্তার উপর বাস করতাম, তারপর বাড়ীর কর্তারা বাড়ীতে না থাকতে পারাই নিরাপত্তাহীনতায় ভূগতে হতো।
মান্নান বলেন, মাঝে মধ্যে সুন্দরবনের ডাকাতরাও জোরপূর্বক আশ্রয় নিয়ে থাকতো রাস্তার উপর গড়ে ওঠা বস্তিগুলোতে। সামাজিক নিরাপত্তা না থাকায় মাঝে মধ্যে ঘটত নানা ধরণের অঘটন। একদিকে ছিলো নিরাপত্তার অভাব আর অন্যদিকে দারিদ্রতা। সহায় সম্বলহীন ছিন্নমূল মানুষ আইলার পর ৩ বছর কোনো ফসল না লাগাতে পেরে ব্যাংক ও এনজিওদের ঋণের জালে আটকাও পড়েছিল। ঋণ পরিশোধ কিভাবে হবে তাদের জানা ছিল না। এক সময় বন্যার পানি সরে গেলে বাড়ী ফিরতে থাকে মানুষ। কিন্তু যাদের জমি, ভিটে-মাটি নদীতে বিলিন হয়েছে তারা ফিরবে কোথায়? ভুমীহীন পরিবারগুলো থেকে যাই রাস্তার উপরে।
সুতারখালী ও কামারখোলা ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, আইলার ৯ বছর পূর্ণ হলেও ভিটে-মাটি নদীতে ভেসে যাওয়ায় অনেকেই রয়ে গেছেন রাস্তার উপরে। এখনো ভাঙ্গন কবলীত এলাকায় শত শত পরিবার রাস্তার উপর বাস করছে। সুতারখালী ইউনিয়নে ৫৮টি পরিবার আদর্শ গ্রামে ঘরবাড়ী পেলেও অধিকাংশই রয়েছে বঞ্চিতদের তালিকায়। তাদের নেই গোসল করার পানি, খাবার পানি, সবজি বাগান, নেই স্বাস্থ্য সম্মত পায়খান।
বাইনপাড়া গ্রামের শাহাদাৎ গাজী(৫৫) রাস্তার উপর বাস করেন। তিনি বলেন, বাবা আমাগি ভিটি মাটি সব ভাসে গেছে। তাই রাস্তায় পুড়ে রইছি। কত প্যান্ট কোট পরা নোক ফটোক তুলে নেজায়, আমাগি দুঃকির কাহিনী শোনে। কিন্তু আমরা কনে ঘর বানতি যাব তা কেব্বুই কই না। একই ভাবে বলে অমেনা বিবি(৪৮)।
আইলার পর থেকে রাস্তার পাশে বাস করে নলিয়ান তালতলা গ্রামের সাইদার হোসেন ও তার আত্মীয়-স্বজনরা। তারা বলেন, কাজের অভাব, পানির অভাব, খাবারের অভাব আমারগো অভাব থাকি গেছে। এ অভাব কবে কাটবে জানিনে। আইলার পর ৯বছর হলো কিন্তু আমাগে বাবাতো বসত বাড়ি ছিল, তা সব বড় রাস্তার বাইরে পড়ে গেছে। রাস্তার পার থ্যাকি কোন রকম খাটি খাই পুরি যাচ্ছি।
কামারখোলা গ্রামের কৃষক বিনয় কৃষ্ণ মন্ডলের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, ২০০৯ সালে আইলায় প্লাবিত হয় এ অঞ্চল। জোয়ারের পানি ওঠা-নামা করে ২০১১ সাল পর্যন্ত। এ সময় কৃষি কাজ ছিল ব্যাহত। জমিতে আর সোনার ফসলের শীষের দোলা দেখতে পেতাম না। পেশায় ছিলাম কৃষি কাজে নিয়োজিত। তাই পারলাম না আর বসে থাকতে। স্বপ্ন দেখলাম সোনালী ফসল ফলানোর। নিজের ছিল ৫ বিঘা, আর বর্গা নেয় ৫ বিঘা। পানি ওঠা-নামার মাঝে মোটা জাতের ধান চাষ করলাম। ধান গাছের অবস্থা ছিল খুবই ভালো। এক সময় পানির সাথে উঠতে থাকে পলি মাটি। পলি মাটি জমে যাওয়ায় ধান গাছের মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যায়। চিন্তায় পেয়ে বসে কি করে কাটাব সারাটি বছর। এর মধ্যে হয়ে গেল রাস্তার বাঁধ। এলাকার সবাই মিলে করলাম আমন চাষ। ফলনও খুবই ভালো হয়ে ছিল। এ বছর আমন চাষ করে বিঘা প্রতি ১৯ থেকে ২২ মণ ধান পেয়েছি।
আইলায় বিধ্বস্ত এলাকার অন্তত ২৫ জনের সাথে কথা বলে জানা যায়, বন্যায় তাদের ব্যাপক ক্ষয় ক্ষতি হয়েছিল। তখন বিভিন্নভাবে অনুদান পেয়ে জীবনযাবন করে। পানি কমে গিলে অনেকেই নিজস্ব ভিটাতে ফিরে এসে অনুদানের টাকা পয়সা দিয়ে পূনরায় বাড়ি ঘর নির্মাণ করে। আইলার ৯ বছর পার হলো, কিন্তু রাস্তার উপর বসাবাসের বিষয জানতে চাইলে। তারা আরও জানাই, অনেকের বসত বাড়ি নদী গর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। তাই তারা রাস্তায় বসবাস করে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে ছিল গচ্ছিত অনেকের কিছু টাকা পয়সা। অনুদানের টাকা এবং গচ্ছিত টাকা একত্রিত করে আবার অন্যত্রে জায়গা কিনে এলাকা ছেড়ে চলে গেছে গৃহহীনেরা। তবে অসহায় মানুষগুলি আজও বাড়ী ফিরতে পারলো না, রাস্তাই রয়ে গেল আর কবে ফিরতে পারবে তা কে জানে ? তারা জানায়, আইলা’র কথা এখনো তাদের চোখে ভেসে ওঠে। তাই এসময় যাদের কৃষি জমি আছে আইলার পরে তাদের ফসল বেশ ভালো হলেও সমস্যা একটি। বিদেশী ঠিকাদারের মাধ্যমে আইলায় ভেসে যাওয়া এলাকার ওয়াপদার রাস্তা নির্মাণে কাজ চলছে। কিন্তু কাজের গতি অতিধীর হওয়ায় সব সময় তাদের আতংকে থাকতে হয়।
কামারখোলা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পঞ্চানন মন্ডল বলেন, ৩০টি পরিবার এখনো রাস্তায় আছে। তাদের প্রধান সমস্যা সুপেয় পানি সংকট, যোগাযোগ ব্যবস্থা নাজুক। উদ্ভাসিত সমস্যার বিকল্প কর্মসংস্থান নেই। তিনি আরও বলেন, এলাকার বিভিন্ন খালগুলো ক্ষমতাসীন দলের নেতারা দখল নিয়ে ঘের করায় স্থানীয় দরিদ্র হতদরিদ্র মানুষেরা বসবাসের ঠাই পাচ্ছে না।
সুতারখালী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মাসুম আলী ফকির মুঠোফোনে জানান, এলাকায় প্রায় ৪শত পরিবারের বসবাস রাস্তায়। তাদের থাকার জন্য নেই নিজস্ব কোন জায়গা জমি। তিনি আরও জানান, বিশ্ব ব্যাংকের আর্থায়নে চীনা ঠিকাদেরর মাধ্যমে ভেড়ীবাঁধ নির্মাণের কাজ চলছে। কিন্তু নদী ভাঙ্গনের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে না করে অন্য জায়গায় নির্মাণ কাজ করছে।