অভিযানে বন্ধ হচ্ছে না ভেজাল ওষুধের দৌরাত্ম্য!

0
908

কেএইচএম:
অ্যালোপ্যাথিক, হোমিও প্যাথিক থেকে শুরু করে আয়ুর্বেদেকি সব ওষুধের মিলছে ভেজাল। এ সব ওষুধ রোগীরা খেয়ে কিডনি বিকল, বিকলাঙ্গতা, লিভার, মস্তিষ্কের জটিলরোগসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। কেউ বা মারাও যাচ্ছেন। ওষুধের মান নিয়ে তাই বিভ্রান্ত হচ্ছে সাধারন মানুষ। এক শ্রেনী ওষুধ কোম্পানী বেশি মুনাফা লাভে তৈরি করছে বিভিন্ন ধরনের ভেজাল ওষুধ। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালালেও কোনভাবেই বন্ধ করা যাচ্ছে না ভেজাল ওষুধের দৌরাত্ম্য।
বুধবার বিকেলে হোমিও প্যাথিক ওষুধ নকল তৈরির কারখানা সন্ধ্যান পায় সোনাডাঙ্গা মডেল থানা পুলিশ। নগরীর খালাসি মাদ্রাসা মোড়ে একটি বাড়ির ৪তলা ব্লিডিংয়ে অভিযান চালিয়ে ওষুধ তৈরির ক্ষতিকারক চিনি, কয়েকটি ড্রাম (চিনি মিশ্রিত কালার পানি), প্যাকাটেজাত করার খালি বোতল ও বিভিন্ন ওষুধের লেবেল, বিভিন্ন কেমিক্যাল ব্যবহৃত বোতল উদ্ধার করা হয়। এ সময় ডাঃ মোঃ হাফিজুর রহমান (৫৬) নামে এক ব্যক্তিকে আটক করেন। সে ওই এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দা মৃত মোঃ উকিল উদ্দিনের পুত্র। ওই সব অবৈধ ভেজাল হোমিও প্যাথিক ওষুধ তার নিজের বাড়ির ৪র্থ তলায় প্রস্তুত করে নগরীতেসহ বিভিন্ন উপজেলায় বিক্রি করতেন। অভিযানে সময় তার ভেজাল ওষুধ বিক্রির মেমোও উদ্ধার করা হয়। এর আগে গত ২২ নভেম্বর র‌্যাব-৬ এর একটি টিম নগরীর হেরাজ মার্কেটে অভিযান পরিচালনা করেন। ওই সময় মার্কেটের তয় তলায় গোডাউনে রক্ষিত ভারতীয় ওষুধ, যৌন উত্তেজক ওষুধ. ফুড সাপ্লিমেন্ট, সরকারি ওষুধ ও বিভিন্ন ভেজাল আর্য়ুবেদিক ওষুধও জব্দ করেন।
সূত্র মতে, চিকিৎসকদের কমিশনের লোভ, আইন প্রয়োগের শৈথিল্য, প্রশাসনের নজরদারির অভাব, দুর্বল বিচার ব্যবস্থা, প্রযুক্তিগত অসমর্থতা, দক্ষ প্রশিক্ষিত জনবলের অভাবে ভেজাল ওষুধ বাজারজাতকরনের প্রধান কারণ বলে মনে করছেন তারা।
জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ আরাফাতুল আলম বলেন, বিশেষ সূত্রে তথ্য পেয়ে ওই খানে অভিযান চালান। অভিযানে দেখা গেছে, আটককৃত ডাঃ হাফিজুর রহমান দাবি করেন এটা একটি ল্যাবরেটরিজ। তিনি এখানে হোমিও প্যাথিক ওষুধ তৈরি করেন। কিন্তু দেখা যায় এখানে ল্যাবরোটরির কোন চিহৃ নেই। মানসন্মত কোন পরিবেশের বালাই নেই, চরম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ওষুধ তৈরি করছেন। যাদের দিয়ে প্রস্তুত করাচ্ছেন এর সম্বন্ধে তাদের কোন অভিজ্ঞতা নেই। তিনি পেশায় একজন কৃষি শ্রমিক। এছাড়া এ আর এইচ ফার্মাসিউটিক্যাল ল্যাবরেটরিজ, খুলনা বাংলাদেশ কোম্পানীর নামে প্রস্তুত করছেন। ওই কোম্পানীর মেয়াদ উত্তীর্ণ লাইসেন্স ব্যবহার করছেন। তার সামগ্রী ওই সব ওষুধ সেবাগ্রহীতা বা এই ওষুধ যারা গ্রহণ করবেন তাদের জীবনের জন্য ক্ষতিকর। ওই ওষুধ প্রস্তুত করে বাজারজাত করছেন। সে কারণে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষতি আইন ২০০৯ সালে ৫২ ধারায় তাকে ৬ মাসের জেল এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও ২ মাসের বিনাশ্রম কারাদন্ড প্রদান করেন। এছাড়া জব্দকৃত ভেজাল ওষুধ বাজেয়াপ্ত করে তারা পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেয়া হয়।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মেডিসিন বিভাগের সহকারি রেজিস্ট্রার ডাঃ শৈলান্দ্রনাথ বিশ্বাস বলেন, রেজিস্ট্রি বিহীন ওষুধ ও ভেজলা ওষুধ ওষুধ সাধারণ জনগন না বুঝে সেবন করলে শরীরের নানান ধরনের জটিলতা দেখা দেবে। অ্যালোপথিক ও হোমিও প্যাথিক যে কোন নামে ভেজাল তৈরি হচ্ছে। এ সব ওষুধ কোন রোগী এমনকি সুস্থ মানুষও গ্রহন করে তাহলে তার শরীরের পরিপাকতন্ত্র, গ্যাস্টক, আলসার, ক্ষুধামন্দা, ডায়েরিয়া, অপুষ্টি, খাবারে অরুচি, কিডনি সমস্যা, কিডনি অকেজো হয়ে যাওয়া, চমড়ায় বিভিন্ন রকম প্রদাহসহ মারাত্মক শারীরিক সমস্যা হতে পারে এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে রোগীর মৃত্যুও ঘটতে পারে। তিনি বলেন, সাধারণ রোগী এবং সাধারন জনগনকে ওষুধের প্রতি সচেতনতা বৃদ্ধি ও সম্পুর্নরূপে পরিহার করার পরামর্শ দেন।
সোনাডাঙ্গা থানার এএসআই অনুপ ঘোষ বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানতে পারি আটক ডাঃ হাফিজুর রহমান দীর্ঘ বছর ধরে হোমিও প্যাথিক যৌন উত্তেজক জিন সেং সিরাপ, আলফালাফা সিরাপ, পালসেটিলা ও  চায়না সিরাপ হোমিও প্যাথিক ওষুধ ঘরে বসে লেবেল, বোতল ও ক্ষতিকারক চিনি ও ক্ষতিকারক রং মিশ্রন করে ড্রমারে মধ্যে মিশিয়ে প্রস্তুত করেন। আটককৃত স্বীকার করেন ওই কোম্পানীর পরিচালক হিসেবে তাপস বিশ্বাস নামক এক ব্যক্তি অংশিদার রয়েছেন। অভিযানে সময় সে পলাতক ছিল। তার নামে ভিজিটিং কার্ড উদ্ধার করা হয় অভিযান থেকে। তিনি বলেন, এগুলো নগরীর খালিশপুর, মাগুরা ও সাতক্ষীলাঞ্চলসহ বিভিন্ন স্থানে বাজারজাত করছেন। ওই সব ওষুধ লেবেল ও বোতলজাত করার জন্য ইকবাল হোসেন এক ব্যক্তি রয়েছে। যিনি পেশায় একজন শ্রমিক। সোনডাঙ্গা থানার মোবাইল ২২ এর টিমে এসআই উজ্জ্বল সরকারের নেতৃত্বে ও এসআই জিয়াউর রহমানসহ সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
অভিযানে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন নামের ওষুধের লেবেল, খালি বোতল ও কয়েকটি ড্রাম রয়েছে। ড্রামের মধ্যে চিনি ও রং দিয়ে পানি মিশিয়ে। অনেকে বোতলে ভেজাল ওষুধ কয়েকশ বোতল রয়েছে। যেগুলো এখনো ওষুধের লেবেল লাগানো হয়নি। বিভিন্ন জায়গায় বাজারজাত করার তালিকাও পাওয়া যায়। এছাড়া আরও ভেজাল ওষুধ প্রস্তুতির জন্য বস্তা ভর্তি খালি বোতল, কার্টুর্ণ ভর্তি বিভিন্ন ওষুধের নামে লেবেল, ভারতীয় ওষুধের নামের ওষুধও উদ্ধার করা হয়। এছাড়া ওই ভেজাল ওষুধের তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময় কয়েকটি হাড়ি. ড্রাম, ক্ষতিবারক চিনি ও বিভিন্ন ভেজাল ওষুধ তৈরির বিভিন্ন ক্যামিকার বোতল দেখতে পাওয়া যায়। ##