হিমালয় কন্যা নেপালের পথে পথে

0
151

শেখ ফারুক হাসান হিটলু
আকাশের সীমার মধ্যে নিরন্তর মেঘের খেলা। নীচে হিমালয়ের চুড়া । মাঝামাঝি ভাসছি আর উড়োজাহাজের জানালায় চোখ। শ্বেত বরফের উপর সূর্যের আলোর বর্ণিল আভা, ভাবনার রেখা ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে । আর কিছুক্ষণ পরেই হিমালয় কন্যা নেপালের ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে অবতরণ করছি, এই ঘোষণা ককপিট থেকে পাইলটের কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে । শূন্যে ভাসা স্বপ্ন নিয়ে মাটির বুকে নেমে আসার আগে বিচিত্র অনুভূতিতে মন আছন্ন। ত্রিভুবন বিমানবন্দর বেশ ব্যস্ত পর্যটকদের আনাগোনায় । বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা সেরে পূর্বেই ঠীক করে রাখা নেপালি গাইডের হাতে নিজেকে সমর্পণ করে , গাড়িতে উঠে বসি । কিছুদিন আগে নেপালে ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়েছে। সাজানো গোছান নয়, ভূমিকম্পের চিহ্ন সারা কাটমুন্ডুর শরীরে । ভাঙা বাড়ি ঘর , রাস্তার পুনঃ নির্মাণ চলছে। নির্মাণ কাজের জন্য ধূলিময় পথঘাট আর বাতাস। কাটমুন্ডুকে পাস কাটিয়ে সোজা পোখরার পথে । দীর্ঘ আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা পেরিয়ে , নেপালি নাগরিকদের সহজিয়া জীবনযাত্রা আর পাহাড় দেখতে দেখতে দিনের আলোর শেষে, সন্ধ্যের অন্ধকারে ডুবে গেলাম। এখন গাড়ির ভিতরে শুধুই বন্ধুদের কথামালা ,পথে কিনে নেওয়া পানীয় চিপস আর খন্ড হাসির হল্লা । ধীরে ধীরে রাত বাড়ছে , অন্ধকারও গাঢ় হয়ে গ্রাস করছে চারপাশ। বিপরীত দিক থেকে আসা যানবাহনের হঠাৎ আলো , আলোকিত করছে পথ ঘাট আর কল-কাকলি মুখর মুখগুলো। এক সময় ক্লান্তিহীন যাত্রা শেষে শৈল শহর পোখরার শীতল রাত গায়ে মেখে রেস্ট হাউসে নেমে পড়লাম। ফ্রেশ হয়ে রাতের খানাপিনার পর, বেলকনীতে বসে কুয়াশার চাদর ভেদ করে দূর পাহাড়ের আবছায়া অপার্থিব রূপ দেখছিলাম । দেখতে দেখতে মন, চেতন অবচেতনের মাঝে সাঁতার কাটে সীমাহীন। মানবজীবনের এই সাঁতার আর ঢেউয়ের খেলা সততই আনন্দময় ।
সকালবেলা সূর্যের আলো ঝলমলিয়ে ওঠে , চোখের উপর আলো পড়তেই বিছানা ছেড়ে উঠি। পোখরার প্রথম সকাল তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়ি । শান্ত সমাহিত পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে নয়নাভিরাম লেক পাড়ে চলে আসি। লেকের পানিতে নৌকা ভাসে , স্বাস্থ্য সচেতন ইউরোপীয়, নেপালী,মোঙ্গলীয়, মুখাবয়বের মানুষের সমাহার, তারা প্রাতঃভ্রমণ করছে। চুপচাপ একটি বেঞ্চের উপর বসে নিভৃত মনে বেশ খানিকটা সময় কাটিয়ে দেই। পাতলা কুয়াশার চাদর ভেসে ভেসে যায়। নাক, মুখ, চোখ , চুল ভিজিয়ে । কুয়াশা ফিকে হলে, গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে ছোট্ট একটি পাখি , মাটিতে নেমে পড়ে খাবারের খোঁজে । খুঁটে খুঁটে সবুজ ঘাসের ডগা কীট পতঙ্গ খায়। রোদ চড়ে গেলে উঠে পড়ি ওখান থেকে।
পিচ ঢালা রাস্তা পেরিয়ে সারিসারি রেঁস্তোরা । বন্ধুরাও দলবেঁধে হাজির । সদলবলে ঢুকে পড়ি একটিতে । নেপালিদের ব্যবহার অত্যন্ত সাবলীল সহজ ও আন্তরিক । তারা প্রচুর পর্যটকদের সাথে চলাফেরার কারণে অভ্যস্তও বটে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে সবাই মিলে নগর দর্শনে বেরিয়ে পড়ি। মানুষের কর্ম ব্যস্ততা খুব বেশি নয় । জীবনযাপনও সাদামাটা । ভ্রমনার্থিরাই পাহাড়ি এই শহরে, অবকাশ যাপনে এসে চাঞ্চল্য তৈরি করেছে। ঘুরতে ঘুরতে পোখরা শহরের নীচ দিয়ে প্রবাহিত এক ঝর্নাধারা, সেখানে গেলাম। স্থানীয় মানুষেরা দেবতার কৃপা ধন্য এ জলধারাকে পুণ্য জ্ঞানে শ্রদ্ধা জানায় । পাহাড়ের খাঁজ বেয়ে নামতে নামতে বেশ গভীর দিয়ে আর এক পাহাড়ের ভিতরে প্রবেশ করে জলের ধারাটি হারিয়ে গেছে । সেখান থেকে বিশ মিনিটের দূরত্বের আর এক পাহাড়ের উপর বিখ্যাত এক মন্দির। ফুলের সাজি কিনে ওই মন্দিরের ভক্তদের সাথে প্রাঙ্গণে গিয়ে দাঁড়ালাম । মন্দির প্রাঙ্গণটি খোলামেলা সুন্দর । ওখানে দাঁড়িয়ে পোখরা শহরটির বেশ দৃষ্টি গ্রাহ্য হয়। দূরে পাহাড় শ্রেণি সারিবদ্ধ সবুজ। মাঝখানে সমতলে ঘরবাড়ি ঘনসন্নিবদ্ধ । রাস্তার দুইপাশে দোকান পাট। মন্দিরের চাতালে অনেক কবুতর ওড়াউড়ি করছে। খাবার কিনে ওদের দিলাম। খাবার খাওয়ার অপূর্ব ভঙ্গি আর গলা ফুলিয়ে ,চোখমুখ ঘুরিয়ে এদিক ওদিক তাকানো, ঝকঝকে ডানামেলে উড়ে যাওয়া আকাশের দিকে , যেন প্রকৃতি প্রদত্ত আভিজাত্য নিয়ে আনন্তের দিকে গমন। ভক্তগণ পূজার নৈবেদ্য সহ নিজেকে সমর্পণ করছে গভীর শ্রদ্ধায়। হালকা শীতের মধ্যে সূর্যের মিষ্টি রোদ, বেশ আরামদায়ক লাগছে। মন্দির থেকে বেরিয়ে চলতি পথেই এক রেস্তোরায় নেমে সিঙ্গারা পেলাম , আমাদের দেশের মতোই। বেশ কয়েকটা সাবাড় করলাম সবাই মিলে, সাথে চা। পাশেই ছিল শীত বস্ত্রের দোকান , পরবর্তী গন্তব্যের কথা ভেবে সকলেই কিছু কিছু অতিরিক্ত শীতের জিনিস কিনে নিলো ।
ওখান থেকে আমরা চলে আসলাম মাউন্টেনিয়ারিং মিউজিয়ামে । খুব সুন্দর করে সাজানো মিউজিয়ামটি । ভিতরে প্রবেশ করার পরই হিমালয় পর্বতমালা ভেসে ওঠে । কত কত অভিযানের ছবি , অভিযাত্রীদের বীরত্বগাঁথা , এভারেস্ট , কাঞ্চনজঙ্ঘার মায়াবী ভুবন । ওখানে দাঁড়িয়ে একেবারে সাধারণ ঘরকুনো মানুষও অভিযাত্রী হওয়ার বাসনা পোষণ করবে এটি নিশ্চিত বলা যায়। বিভিন্ন স্কুলের বাচ্চারা এসেছে দলবেঁধে । কোন অভিযাত্রীর পোশাক , অভিযানে ব্যবহার করা জুতা , কুঠার, অক্সিজেন বোতল , দড়ি ,বেল্ট , তাঁবু দেখে চোখে মুখে অনাবিল বিস্ময় । আর সুদূরের স্বপ্নে বিভোর তারা। বাইরে মাঠের মধ্যে কৃত্রিম পাহাড় বানিয়ে রাখা। সেখানে চড়ার চেষ্টারত কেউ কেউ । পাশেই ধাতব বাইসনের স্কাল্পচার খুবই অসাধারণ । মিউজিয়াম দেখা শেষ করে রেস্ট হাউসে ফিরে আসি। এবং আহারান্তে বিশ্রাম নেয়ার জন্য রুমে প্রবেশ করি। সন্ধ্যার বেশ কিছুক্ষণ পরে সারাদিনের ক্লান্তি ঝেড়ে রাতের পোখরা দেখতে বের হই।
আলো ঝলমল লেক রোড । দুই পাশে বাহারি দোকান , প্রচুর রেস্টুরেন্ট , বার । নেপালি ছাড়াও বহু দেশের ভ্রমণ প্রিয় মানুষের স্বচ্ছন্দ চলাফেরা। কপোত কপোতীরা পরিবেশটা আনন্দময় করে রেখেছে । জীবনের উৎসবে রঙিন, মানুষগুলো টগবগ করে ফুটছে । জীবন যেন এভাবেই আনন্দিত চিত্তে কেটে যাবে আর কোন ভাবনা নেই। দলবেঁধে আমরাও হারিয়ে যাই এই স্রোতে।হেঁটে হেঁটে লেক রোডের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত যাই, যতদূর আলো ঝলমল করে। বিভিন্ন ব্রান্ডের শোরুমে ঢু মারি, সাথে সাথে নেপালিদের তৈরি এথনিক জিনিস পত্রের দোকান থেকে কিছু কেনাকাটা করি। এক সময় শ্রান্ত হোয়ে খুঁজে খুঁজে লেকপাড়ে একটা নিরিবিলি রেস্তোরাঁ পেয়ে বসে পড়লাম । একজন গায়ক একটি গীটার হাতে সূরের মূর্ছনা তুলছে গভীর আবেগে। গানের সূরে গায়ক একে চলেছে, ভালবাসার কোন মায়াবী দৃশ্যকল্প । হিমেল পরিবেশে খোলা মাঠে বসে সেই সূরের সাথে ,পরিচ্ছন্ন আকাশ আর তাঁরার ঝিকিমিকি দেখছি । রাত বাড়ার সাথে সাথে শীত বাড়তে থাকে। কাঠের আগুন জ্বেলে উত্তাপ বাড়িয়ে দেয় রেস্তোরাঁর কোনও কর্মী । ওখানেই রাতের আহার সারি। অলস আর অখণ্ড অবসর যাপনের প্রিয় পোখরার সময়টুকু ভেসে যায় কেটে যায় । গভীর রাতে রেস্ট হাউসে ফিরতে ফিরতে পোখরার জন্য আক্ষেপ জমা রেখে , আগামি দিন সকালে অজানা জমছম সিটি আর অন্নপূর্ণা রেঞ্জ দেখার উদ্দেশ রওনা দিতে হবে, এই উত্তেজনায় নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি ।( চলবে )