বেঁচে থাকার তাগিদে ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বিএল কলেজের এক সময়ের মেধাবী ছাত্র দিপকের এখন দিন চলে শ্রম বিক্রি করে !

0
881

সময়ের পরিক্রমায় মনে রাখেনি কেউ

শেখ নাদীর শাহ্:::


দীপক কুমার বিশ্বাস। একটি সম্ভাবনাময় ঝরে পড়া গল্পের নাম। ছাত্র জীবনে প্রচন্ড মেধাবী ছিলেন। সাহিত্যাঙ্গনেও ছিল অবাধ বিচরন। স্কুল জীবন থেকে সরাসরি ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়াকালীণ বঙ্গবন্ধুর নীতি-আদর্শ,রাজনৈতিক দর্শন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উপর ভর করে তাকে আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে আকৃষ্ঠ করে। বলতে গেলে আ’লীগের দুঃসময়ে ক্ষুধে অবস্থায় বড়দের পেছনে দাপিয়ে বেড়াতেন মিছিল-মিটিংয়ে। বিষয়টি তৎকালীণ স্থানীয় রাজনীতিকদের নজরে আসায় ৮ম শেণীতে পড়াকালীণ তাকে করা হয় ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সভাপতি। ক্ষুধে রাজীতিকের অনুপ্রেরণার উৎস্য হিসেবে দেখা দেয় বিষয়টি। আরো দূর্বার গতিতে এগিয়ে চলা শুরু হয় তার। পালন করেন কপিলমুনি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব। তবে ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে জীবিকা নির্বাহে তিনি এখন শ্রমিক। কখনো শ্রম বিক্রি করেন,ট্রাকের ছাদে,কখনো ভ্যান ঠেঁলে আবার কখনো নদীতে মাছ ধরার কাজে।

এদিকে ছাত্রাবস্থায় রাজনৈতিক চাপ ছোট্ট দিপকের বেড়ে ওঠায় পেছনে ফেলতে পারেনি। ১ম শ্রেণি থেকে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত স্থানীয় ৬৭ নং রেজাকপুর কাশিমনগর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম স্থান দখলে ছিল। এরপর খুলনার অন্যতম প্রধান বিদ্যাপীঠ দানবীর স্বর্গীয় রায় সাহেব প্রতিষ্ঠিত কপিলমুনি সহচরী বিদ্যা মন্দিরে ৬ষ্ঠ শ্রেণী থেকে কখনো ১ম কখনো দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও ৯ম শ্রেণীতে ফের তার দখলে যায় ১ম স্থানের মুকুট। স্কুল জীবনে বিভিন্ন শ্রেণিতে মনিটরের দায়িত্ব পালনে শুরুতেই যোগ্য নেতৃত্ব দানের স্বাক্ষর রেখেছিলেন। এরপর ২০০৬ সালে বিজ্ঞাণ বিভাগ থেকে এসএসসিতে জিপিএ-৪.১৩ গ্রেডে উত্তীর্ণ হয়ে অর্থনৈতিক দৈন্যতার কারণে ঐ বছরেই ফুল ফ্রিতে পড়া-লেখার সুযোগে প্রথমে যশোরের হিজলডাঙ্গা শহীদ ফ্লা:লেফ: মাসুদ মেমোরিয়াল কলেজে ভর্তি হন। তবে সেবার প্রাকৃতিক দূর্যোগে চারপাশে প্লাবিত থাকায় পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মায়ের কাছে থাকতে ২০০৭ সালে ট্রান্সফার সার্টিফিকেট নিয়ে ফিরে আসেন বাড়ীতে। ভর্তি হন কপিলমুনি কলেজে। ২০১০ সালে কপিলমুনি কলেজ থেকে বিজ্ঞাণ বিভাগে এইচ এস সিতে ৩.৫০ গ্রেডে পাশ করেন। বহু কষ্ঠে স্থানীয়দের সাহায্য-সহযোগীতা নিয়ে ২০১০ সালে বিনা কোচিংয়ে অর্থনীতিতে ফার্স্ট মেরিটে ¯œাতক শ্রেণীতে ভর্তি হন খুলনা ব্রজলাল কলেজে (বিএল)। তার শ্রেণি রোল ছিল-১৭৯৭। তবে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম বাবার আকষ্মি অসুস্থ্যতায় কোন রকম পড়া-লেখা চালিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত অর্থ কষ্টে আর ফরম পূরণ করা হয়ে ওঠেনি তার।

এরপর বৃদ্ধ বাবা-মা ও ৩ বোনের জীবিকা নির্বাহ ও ছোট দু’বোনের পড়া-লেখা চালিয়ে যেতে শুরু হয় তার সংগ্রামী কর্মময় জীবন। প্রথমে স্বল্প পারিশ্রমিকে একটি ওষুধ কোম্পাণীতে চাকুরী নেন। ধারণা ছিল,সবার ভরণ-পোষণের পাশাপাশি চালিয়ে নিতে পারবেন নিজের পড়া-লেখাটাও। কিন্তু মাঝ পথে কোম্পাণীটা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ফিঁকে হয়ে যায় ভবিষ্যত। এরপর ওজোপাডিকো (বিদ্যুৎ বিভাগ),খুলনায় চাকুরী করতে পিতার একমাত্র সম্বল ১০ শতাংশ জমি ও মায়ের স্বর্ণালংকার ও বাবার সোনালী ব্যাংক,মাগুরা শাখায় ডিপিএস’র অনুকূলে জমানো যৎসামান্য টাকাসহ সর্বস্ব খোঁয়া যায় মধ্যস্বত্ত¡ভোগী (দালালদের) খপ্পরে পড়ে। নিরুপায় হয়ে পড়েন বাবা-মায়ের একমাত্র অবলম্বন ও জেলে পল্লীর এক সময়ের সম্ভাবনাময় দিপক।

তবে হাল ছাড়েননি তিনি। রাজনৈতিক গন্ডিও পিছু ছাড়েনি তার ২০০৯ সালের কাউন্সিলে ছাত্রলীগের কপিলমুনির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান তিনি। দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর দায়িত্ব পালনের পর ২০১৮ সালের সিলেকশন কমিটি গঠনে দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার পর বঙ্গবন্ধু সৈনিকলীগের খুলনা জেলা কমিটির সদস্য ও উপজেলা আহŸায়ক কমিটির সদস্য সচীবের দায়িত্ব পালন করছেন। বিভিন্ন সময় জাতীয় ও স্থানীয় সরকার পরিষদ নির্বাচনে দলের পক্ষে ভোট প্রার্থনার পাশাপাশি পালন করেছেন পোলিং এজেন্টের মত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

পড়া-লেখার পাশাপাশি সাহিত্যাঙ্গনেও ছিলেন,সব্যসাচী। কবিতা লেখা ছিল তার নেশা। প্রবন্ধও লিখেছেন বিভিন্ন ম্যাগাজিনে। বিভিন্ন সময় বহুল প্রচারিত বিভিন্ন দৈনিকে তার অনেক লেখা বেরিয়েছে। লেখায় সুচিন্তিত ও ক্ষুরধার লেখনির জন্য স্থানীয় প্রগতি লেখক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মনোনীত করা হয়। ছিলেন,খুলনা সাহিত্য মজলিশের সম্মানিত সদস্য। স্বাধিনতা যুদ্ধকালীণ সময়ে দেশের সর্ববৃহৎ কপিলমুনি রাজাকার ঘাঁটি সংরক্ষণ ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি যাদুঘর স্থাপন ও সরকারি স্বিকৃতীর দাবিসহ এলাকার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আ’লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সাথে তার কার্যালয়ে সরাসরি সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছিল দিপকের। সেসব স্মৃতি আঁকড়ে এখনো পুলকিত ও কিছু করতে নাপারার বেদনাকে আঁড়াল করেন তিনি।

এর আগে ছাত্রলীগের দায়িত্ব পালনকালীণ সময়ে আওয়ামীলীগ সরকারে আসীণ থাকলেও বরাবরের মত ভাগ্য বিড়ম্বিত থাকেন দিপক। সংসারের ভরণ পোষণের জন্য কখনো ট্রাক শ্রমিকের কাজ,কখনো নদীতে মাছ ধরতে বাবার সহযোগিতা আবার কখনো বিভিন্ন কোম্পাণীতে শ্রমিকের কাজ করলেও সরকারী কোন প্রকার সুযোগ-সুবিধা বা অনুদান নেননি দিপক ও তার পরিবার। দিপক এখন একেবারেই বেকার। কাজ নেই,উপার্জনও নেই। বৃদ্ধ বাবা জগন্নাথ বিশ্বাস (৬৫) মৃতপ্রায় নদীতে জাল ধরে কোন রকম সংসারটাকে টিকিয়ে রেখেছেন। তবে শারীরীক অসুস্থ্যতায় সব দিন নদীতে যাওয়া হয়ে ওঠেনা। তাই প্রায়ই অভূক্ত থাকতে হয় তাদের। তবে তার জন্য কারো প্রতি কোন প্রকার ক্ষোভ বা কষ্ঠ নেই তার। নিজের ভাগ্যকেই দোষারোপ করে এখনো স্বপ্ন দেখেন শুধু বেঁচে থাকার। সম্প্রতি স্থানীয় কপিলমুনি কলেজের চতুর্থ পদে ল্যাব সহকারী পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিলে অনেকের মত তিনিও বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন খুঁজতে আবেদন করেন সেখানে। তার বিশ্বাস বর্তমান আ’লীগ সরকারের শাষনামলে নূন্যতম মূল্যায়ন হবে তার।

এব্যাপারে কথা হয় দিপকের বাবা জগন্নাথ বিশ্বাসের সাথে। তিনি জানান,ছেলেকে বলেছিলাম এনজিও’র ঋণে একটি ভ্যান কিনতে। কিন্তু ও নাছোড় বান্দা। ওর বিশ্বাস, মেধার যথাযথ মূল্যায়নে সাংসদসহ কলেজ কতৃপক্ষ বিনা ডোনেশনে নজর দিতে পারেন তার প্রতি। ইতোমধ্যে পরীক্ষাও সম্পন্ন হয়েছে। তবে এখন অপেক্ষা বেড়েছে ফলাফলের।

নিয়োগ পরীক্ষার দিন দিপকের মত ছেলের চতুর্থ শ্রেণির পদে আবেদন করায় এক সময়ের সহপাঠি,উপস্থিত সাংবাদিক,কলেজ পরিচালনা পরিষদের সদস্যসহ তার এক সময়ের শ্রেণি শিক্ষকদের অনেকে চোখের পানি সংবরণ করতে পারেননি। অনেকের মত তারাও শুভ কামনা করেছেন তার জন্য। এলাকাবাসীর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সকলের বিশ্বাস দিপকের মত সৎ,যোগ্য,নিষ্ঠাবাণ ও কর্তব্যপরায়ন ছেলেকে কোন প্রতিষ্ঠান কাজ দিলে উপকৃত হবেন তারা। এক কথায় দিপকদের কর্ম সম্পৃক্ত করলে পথ হারাবেনা বাংলাদেশ। অনেকের মত দিপকেরও বিশ্বাস,বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলায় তার যোগ্য উত্তরসূরী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় জেগে ওঠা নতুন বাংলায় আর যাই হোক হয়তো, না খেঁয়ে মরবেননা তারা।