কয়রা থানার ৭৩ জন যুদ্ধাপরাধীর তালিকা

0
89

নিজস্ব প্রতিবেদক
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন মানবতাবিরোধী কর্মকান্ডে জড়িত থাকায় কয়রা থানা ৭৩ জন যুদ্ধাপরাধীর তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সুপারিশ ও থানা পুলিশের তদন্তের পর উপজেলা ও জেলা প্রশাসন এ তালিকা প্রেরণ করে। এদের মধ্যে ৪০ শতাংশ ইতোমধ্যেই মারা গেছে। বেঁচে থাকাদের মধ্যে কেউ কেউ শাসক দল আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। ৭১ সালের মে মাসের পর থেকে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্তরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। এদের বিপরীতে মুসলিম লীগ ও জামায়াতে ইসলামের সাথে জড়িতরা পাকিস্তানের অখন্ডতা রক্ষার পক্ষে নামে। পাক বাহিনীকে সহযোগিতা করার জন্য উল্লিখিত ৭৩ জনকে প্রশিক্ষণের লক্ষে রাজাকার ক্যাম্পে পাঠায়। খুলনার ভূতের বাড়ি আনসার সদর দপ্তরে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়ে রাইফেল নিয়ে তারা কয়রা এলাকায় ফিরে আসে। তৎকালীন সময়ে মুসলিম লীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্তদের মধ্যে জায়গীরমহল গ্রামের কোমর উদ্দিন ঢালী, মঠবাড়ি গ্রামের এলেম বক্স সরদার, বাগালীর ইউপি চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন সানা, কয়রা ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবুল কাশেম হাওলাদার এলাকার যুবকদের রাজাকারে পাঠাতে উৎসাহিত করে।
থানা প্রশাসনের সূত্র জানিয়েছেন, ১৯৭১ সালে আজকের কয়রা ৭টি ইউনিয়ন পাইকগাছা থানার অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৭৯ সালে কয়রা নামে নতুন থানা এবং ১৯৮৪ সালে উপজেলা হিসেবে কার্যক্রম শুরু হয়। এখানে আলবদর ও আল শামস বাহিনীর সদস্যদের অস্তিত্ব পাওয়া যায় নি।
স্বরাষ্ট্রম ন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়, ৭১ সালের ৭ মে নবম সেক্টর কমান্ডার মেজর এম এ জলিলের নেতৃত্বে ভারত থেকে খুলনার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া অস্ত্র ও খাবার বোঝাই একটি লঞ্চ শ্যামনগর থানার চাঁদনীমুখো গ্রামের কাছাকাছি এসে পৌঁছালে পাকবাহিনী গানবোট থেকে হামলা চালায়। মুক্তিযোদ্ধাদের লঞ্চ থেকে ১৯ জন মুক্তিসেনা এসে কয়রা ইউনিয়নে আশ্রয় নেন। তৎকালীন সময়ের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবুল কাশেম হাওলাদার ৯ মে মুক্তিসেনাদের পাকবাহিনীর গানবোটে তুলে দেয়। এদের মধ্যে কেউ কেউ গানবোট থেকে লাফ দিয়ে সাঁতরে তীরে উঠে। পাকবাহিনী বেশ কয়েকজন মুক্তিসেনাকে খুলনায় এনে গুলি করে হত্যা করে।
প্রশাসনের তালিকা অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধীরা হচ্ছে আমাদী ইউনিয়নের জায়গীরমহল গ্রামের শাহ মোঃ রেজাউল করিম, আমাদী গ্রামের সলেমান সরদার, মসজিদকুড় গ্রামের মাওলানা সাইদুর রহমান, ক্বারী বনি আমিন সিদ্দিকী সানা, নাকশা গ্রামের মোঃ দলাল সানা, জেহের আলী গাজী, বাগালী ইউনিয়নের ঘুগরাকাটি গ্রামের মোজহার উদ্দিন শিকারী, কেরামত মোড়ল, আজিজুল শিকারী, ষোলহালিয়া গ্রামের মজিদ গাজী, ইসলামপুর গ্রামের হাবিবুর রহমান গাজী, আবু বক্কর গাজী, আব্দুর রশিদ গাজী, মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের সাতহালিয়া গ্রামের শামসুর রহমান, মোঃ বারিক, মোঃ মজিদ, মোঃ বাবর আলী খাঁ, বাবর আলী সরদার, আবু বক্কর, আমলা গ্রামের গাউস ডাঃ, কালিকাপুর গ্রামের নুরুল হক মল্লিক, বেলায়েত গাজী, মহেশ্বরীপুর গ্রামের আমির হামজা সরদার, ভাগবা গ্রামের নহর আলী সরদার, মহারাজপুর ইউনিয়নের দেয়াড়া গ্রামের আবাস উদ্দিন গাজী, মঠবাড়ি গ্রামের মোঃ আলী সরদার, এলেম বক্স সরদার, জাহেদ আলী মোড়ল, মহারাজপুর গ্রামের আব্দুল হামিদ মল্লিক, মোহাম্মদ মল্লিক, কয়রা ইউনিয়নের ঘাটাখালি গ্রামের মোস্তফা আজিজুজ্জামান, দাউদ আলী গাজী, আব্বাস আলী শেখ, গোবরা গ্রামের আব্দুল জলিল, মোঃ বেলায়েত হোসেন শেখ, ফজলুল হক, মোঃ আফতাব উদ্দিন সরদার, মুজিবর রহমান মিস্ত্রী, রুহুল আমিন, মোঃ নওশের আলী সানা, মৌলভী শামসুর রহমান, মাকসুদল আলম, মোঃ নুরুল আমিন গাজী, আব্দুস সাত্তার সানা, আমজাদ হোসেন সানা, ২নং কয়রা গ্রামের নজরুল ইসলাম গাজী, ঢালী রফিকুল ইসলাম, মফিদ ঢালী, মদিনাবাদ গ্রামের সদর উদ্দিন সানা, ৪নং কয়রা গ্রামের সিরাজ মল্লিক, আমজাদ গাজী, ৫নং কয়রা গ্রামের আইয়ুব লস্কর, আমিনুল হক হাওলাদার, আবুল কাশেম হাওলাদার, বদর উদ্দিন হাওলাদার, উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের সরদার পাড়া গ্রামের সাখাওয়াত শেখ, বাশারাত শেখ, কাঠমারচর গ্রামের ইয়াসিন সরদার, গাজীপাড়ার নুরুদ্দিন সানা, বড় বাড়ির সরদার মোমিন আলী, দিঘীর পাড়ের হাজী হানিফ ঢালী, দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের হলুদ বুনিয়া গ্রামের মোসের আলী গাজী, দক্ষিণ বেদকাশী গ্রামের আব্দুল হাই সরদার, আব্দুস সালাম গাজী, মুনসুর গাজী, সুরত আলী গাজী, আনসার আলী গাজী, আবুল কাশেম গাজী, ইসহাক সরদার, মোসক সরদার, চারমুখ গ্রামের বাহারা গাজী।
মুক্তিযোদ্ধা সংসদের উপজেলা কমান্ডার মতিউর রহমানের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সুপারিশকৃত যুদ্ধাপরাধের তালিকা ২০১০ সালের ১৫ ডিসেম্বর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়। থানা পুলিশের তদন্তের পর এ তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
যুদ্ধকালীন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোঃ কেরামত আলী তথ্য দিয়েছেন, যুদ্ধাপরাধীদের কেউ কেউ বামিয়া গ্রামের শহিদ সোহরাওয়ার্দী ক্যাম্পে এবং হাতিয়ারডাঙ্গা প্রধান ক্যাম্পে ও খুলনা যেয়ে আত্মসমর্পন করে। তাদের জেল হাজতে পাঠানো হয়।
উল্লেখ্য, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব মোহাম্মদ আবু সাঈদ মোঃ ২০১০ সালের ১২ জুলাই রাজাকারদের তালিকা চেয়ে জেলা প্রশাসনকে চিঠি পাঠায়। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ সম্পর্কিত প্রতিবেদন দেয়ার জন্য উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হয়। উপজেলা প্রশাসন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সুপারিশকৃত তালিকা জেলা প্রশাসন ও মন্ত্রণালয়ে পাঠায়।