খুলনায় ক্লাস্টার পদ্ধতিতে মৎস উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে বেকার যুবকদের স্বনির্ভরতা অর্জন

0
150

শবে তাইয়্যেব ইবনে প্রিয়তি:
খুলনায় ডুমুরিয়া উপজেলার বড়ডাঙ্গা এলাকা এখন চিংড়ি চাষের মডেল। এমন ঘোষণা খোদ মৎস অধিদপ্তরের। নেপথ্যে রয়েছে গতানুগতিক মৎস চাষ প্রথার বাইরে নতুন ক্লাস্টার পদ্ধতি প্রয়োগ। এতে একই পুকুরে বাগদা, গলদা ও পারসে মাছ সহ অন্যান্য দেশীয় মাছের উৎপাদন ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে দারিদ্র বিমোচনের সাথে চাষীর স্বনির্ভরতা অর্জন সম্ভব হয়েছে। এই অসাধারণ উদ্যোগ সমগ্র দেশে মডেল হিসেবে প্রয়োগ করা গেলে অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সিনিয়র উপজেলা মৎস কর্মকর্তা সরোজ কুমার মিস্ত্রী এই অত্যাধুনিক, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত মৎস চাষের উদ্ভাবক। খুলনা জেলা প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতায় এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে।
জানা গেছে, মৎস্য অধিদপ্তরের ক্লাষ্টার পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষ সম্প্রসারণ কাজের সফলতায় এ মডেলটি সৃষ্টি হয়েছে। এখানকার চাষীরা সনাতন পদ্ধতির চাষাবাদ ত্যাগ করে আধুনিক প্রযুক্তির হালকা উন্নত চাষ প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকে পড়েছে। ফলে তাদের উৎপাদন বেড়েছে পূর্বের তুলনায় প্রায় দ্বিগুন। পরিবেশ বান্ধব এ চাষাবাদ পদ্ধতিতে রোগ বালাই একেবারেই নাই।
সূত্র জানায়, বড়ডাঙ্গা গ্রামের চিংড়ি চাষীরা দীর্ঘ প্রায় ১০/১২ বছর ধরে চিংড়ি চাষ করে আসছে। সনাতন পদ্ধতিতে চাষাবাদ করার ফলে উৎপাদন ছিল খুবই কম। রোগ বালাই লেগেই থাকত। লাভ হতো অনেক কম। অনেক সময় লোকসানও হয়েছে। বাগদা চিংড়ির উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য ২০১৩ সালে ডুমুরিয়া উপজেলার সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সরোজ কুমার মিস্ত্রী একটি উদ্ভাবনী উদ্দ্যোগ গ্রহন করেন।
বাগদা চিংড়ির ঘেরে চারটি মৌলিক নীতি (যথা ১. ঘেরের পানির গভীরতা কমপক্ষে ৩ ফূট রাখা, ২. পরিকল্পিত নার্সারী স্থাপন করা ৩. ভাইরাসমুক্ত বগদার পোনা মজুদ করা এবং ৪. নিয়মিত সম্পুরক খাদ্য প্রয়োগ করা) অনুসরণ করে চিংড়ি চাষি সুজিত মন্ডলের ৫০ শতাংশের একটি ঘেরে নতুন পদ্ধতির চিংড়ি চাষ শুরু করা হয়। সুজিতের সঙ্গে ছিল আরো পাঁচজন বন্ধু চাষী। মৎস্য অধিদপ্তর এ সকল চাষীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, ঘের পরিদর্শন, ঘেরের মাটি পানি পরীক্ষা ও পরামর্শ প্রদান করেন। ঘেরের পানির গভীরতা বাড়িয়ে ৩ ফুট করা হয়, মজুদ পুকুরের পাশে নার্সারী পুকুর তৈরী করা হয়, ভাইরাসমুক্ত পিএল ব্যবহার এবং নিয়মিত মানসম্পন্ন সম্পূরক খাদ্য প্রয়োগ করা হয়। এ সকল পরামর্শ গ্রহন করায় সুজিতের উৎপাদন বেড়ে যায় দ্বিগুনেরও বেশী।
সনাতন পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষ করার ফলে আগে হেক্টর প্রতি গলদা ও বাগদা চিংড়ির গড় উৎপাদন ছিল যথাক্রমে প্রায় ৪০০-৫০০ কেজি এবং ২০০-৩০০ কেজি। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে চাষাবাদ করার ফলে চাষের ঝুঁকি যেমন কমে যায় তেমনি গলদা, বাগদা ও কার্প জাতীয় মাছের হেক্টর প্রতি গড় উৎপাদন বেড়ে দাড়ায় যথাক্রমে ৬৭০ কেজি, ৪১০ কেজি এবং ৫৭০ কেজি। ফলে এ পদ্ধতির চাষে ঝুঁকি পড়ে ঐ অঞ্চলের চাষীরা। এ সময় উপজেলা মৎস্য অধিদপ্তর এ অঞ্চলের ২৫ জন চাষী নিয়ে গঠন করে একটি ক্লাষ্টার বা দল। দলগতভাবে প্রশিক্ষণ প্রদানসহ অন্যান্য কার্যক্রম চালানো হয়। পরবর্তীতে ২ টি ক্লাষ্টারে এ অঞ্চলের ৫০ জন চাষীকে একত্রিত করে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির কলাকৌশল শিখানো হয়। ধারাবাহিকভাবে প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণের ফলে চাষিদের উৎপাদন বেড়েছে দ্বিগুনের ও বেশী। ২০১৮ সালে গলদা, বাগদা ও কার্পজাতীয় মাছের হেক্টর প্রতি গড় উৎপাদন হয়েছে যথাক্রমে ৯৮০ কেজি, ৫৩২ কেজি এবং ৮৭৬ কেজি যা ২০১৩ সালের উৎপাদনের দ্বিগুনেরও বেশী। শুধু উৎপাদন বৃদ্ধিই নয় নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত মাছ ও চিংড়ি উৎপাদনে বড়ডাঙ্গা গ্রামের ক্লাষ্টার চাষীরা বিশেষ ভুমিকা রাখছেন। মৎস্য অধিদপ্তর এ কার্যক্রমের সম্প্রসারণ ঘটানোর লক্ষে একে চিংড়ি চাষের বড়ডাঙ্গা মডেল হিসেবে ঘোষণা করেছেন। মডেলটি ইতোমধ্যে বাংলাদেশ মৎস্য অধিদপ্তরসহ দেশী বিদেশী সংশ্লিষ্ট সকলের নিকট বিশেষ প্রশংসা লাভ করেছে।
সিনিয়র উপজেলা মৎস কর্মকর্তা সরোজ কুমার মিস্ত্রী খুলনাটাইমসকে বলেন, ২ টি ক্লাষ্টারে ৫০ জন চাষী একত্রিত হয়ে একই প্রযুক্তি গ্রহন ও বাস্তবায়ন করছে। দলগতভাবে চাষের পণ্য সংগ্রহ করায় উৎপাদন খরচ কম হচ্ছে। চাষের ক্ষেত্রে গুড এ্যাকুয়াকালচার প্রাকটিস ও ফুড সেফটি অনুসরণ ও চাষের সকল রেকর্ড সংরক্ষণ করা হচ্ছে। মৎস্য অধিদপ্তর হতে ঘেরগুলো রেজিষ্ট্রেশন করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ক্লাস্টার পদ্ধতিতে চাষের ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ কোন দ্রব্য যেমন গোবর, হাঁস মুরগীর বিষ্টা এবং রাসায়নিক দ্রব্য ও এন্টিবায়োটিক ব্যবহৃত হয় না। তাছাড়া ঘের পাড়ে উৎপাদিত সবজিতে কোন ধরনের পেষ্টিসাইড, এনসেক্টিসাইড বা অন্যকোন রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহৃত হয় না। চাষের ক্ষেত্রে জৈব নিরাপত্তা বজায় রাখা ও রাসায়নিক দুষণ প্রতিরোধ করা হচ্ছে। মৎস্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা ও পরামর্শ অনুযায়ী খামারগুলো পরিচালিত হচ্ছে।
খুলনা জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সারোয়ার আহমেদ সালেহীন খুলনাটাইমসকে বলেন, ক্লাস্টার পদ্ধতিতে মৎস চাষের এই উদ্ভাবনী উদ্যোগের ফলে চাষির উৎপাদন বেড়েছে দ্বিগুনেরও বেশী। আয় বেড়ে চাষের ঝুঁকি কমেছে। রোগ বালাই একেবারেই নাই। উৎপাদিত চিংড়ি শতভাগ নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত বিধায় বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে ঐ বিলের ৩৭৮ টি ঘেরের ৭৫ হেক্টর জলাশয়ে ২২৮ জন চাষি এ পদ্ধতিতে চাষাবাদ করছেন। এ পদ্ধতির চাষাবাদ সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব। সমগ্র দেশে এই পদ্ধতি মডেল হিসেবে প্রয়োগ করা সম্ভব হলে দারিদ্র বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here